আমার প্রথম প্রবাস যাত্রা

প্রথমবার ইতালিতে আসা নিয়ে আমি খুব টেনশনে ছিলাম। কারন সিদ্ধান্ত ছিলো আমি নাবিলকে নিয়ে একা আসবো। সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সময়টা ছিল ২০০২ সাল, হঠাৎ আমার শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে পরাতে সিদ্ধান্ত পাল্টে রাকিব দেশে আসলো। আমাদেরকেও নিয়ে যাবে আবার শাশুড়ীকেও দেখে গেল। এই সিদ্ধান্তে আমি অনেকটাই টেনশন মুক্ত হলাম। ভাবলাম যাক এই দীর্ঘ পথ ছোট বাচ্চা নিয়ে একা একা যেতে হবে না।

আমাদের ফ্লাইট ছিলো রাতে। যাওয়ার দিন আমাকে বিদায় দিতে এয়ারপোর্টে আব্বা আর চাচা এলেন। ওনারাও এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকতে পেরেছিলেন। ওনারা বিদায় নিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে আমার পিছনে থাকা চাচার পায়ে আমার সেন্ডেল সহ পায়ের চাপ লাগলো। উনি ব্যাথা পেয়েছেন তো অবশ্যই। আমার এতো কষ্ট লেগেছিলো। এরপরই ওনারা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

এরপর এয়ারপোর্টের সব ফর্মালিটিজ শেষ করে প্লেনের কাছাকাছি গিয়ে দেখা গেলো নাবিলের পাসপোর্টে অফিসার সীল মারতে ভুলে গেছেন! আমরা আবার পিছনে ফিরে গেলাম সীল নিয়ে আসতে। দেড় বছরের নাবিল আমার কোলে যথারীতি ঘুমে। রাকিবের দুই হাতে ভারি দুইটা ব্যাগ। আমাদের দুজনেরই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল।

কাজ শেষ করে রাকিব দ্রুত হেঁটে প্লেনের দিকে যাচ্ছিল। আমি পেছন পেছন হাঁটছি কিন্তু ওর সাথে তাল মিলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে দ্রুত হাঁটতে গিয়ে আমি পা পিছলে পরে যাই। বাম পা সামনে আর ডান পা মুরে বসে পরেছিলাম। নাবিল তখনও কাঁধে ঘুমে। কোন রকমে উঠে আবার ফুল স্পিডে হাঁটা শুরু করলাম। সাধারনত জনসম্মুখে এভাবে পরে গেলে লজ্জায় মরে যেতাম কিন্তু আমার লজ্জা পাওয়ারও সময় ছিলো না। দ্রুত হেঁটে হাঁফাতে হাঁফাতে রাকিবের কাছাকাছি এসে শুনি ইমিগ্রেশন অফিসার বলছে – প্লেন তো চলে গেছে!

রাকিব কাঁধ ঝাকিয়ে রেগে বলল – তাতে আমার কি! আমি তো হতভম্ব। ভয় পাচ্ছিলাম অফিসার না জানি ওকে আবার কি বলে। তাকিয়ে দেখি অফিসার কিছুটা হতভম্ব হয়ে পাসপোর্ট চেক করে আমাদেরকে প্লেনে উঠার নির্দেশ দিলো। বলাবাহুল্য ঐদিন আমরা ছিলাম লাস্ট পেসেন্জার। আর আমাদের জন্যই প্লেন ওয়েট করছিলো।

এটাই ছিলো আমার প্রথম প্লেনে চড়া। কিছুটা ভয়, কিছুটা আনন্দ নিয়েই নিজের সিটে বসলাম। নাবিলকে নিয়ে ভয়ে ছিলাম না জানি কত বিরক্ত করে। কিন্তু বাচ্চাটা পুরো জার্নিতে কোন বিরক্ত করেনি। সুন্দর করে ঘুমিয়েছে পুরো পথ।

প্লেনে এক ভদ্রমহিলা তার যমজ বাচ্চা নিয়ে একাই রওনা হয়েছিলেন। পুরোটা সময় বাচ্চাগুলো চিৎকার করে কেঁদেছে। কারও কোলে যায়নি। এত কষ্ট লাগছিলো। যমজ ছোট বাচ্চা নিয়ে একা জার্নি করা একদম উচিত না।

আমাদের ট্রানজিট ছিলো দুবাই। ওখানে বিভিন্ন শপ গুলিতে ঘুরছি আর বিভিন্ন ধরনের গোল্ডের জিনিষ গুলি দেখছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার ব্যাগটা হাতে নেই। নাবিলকে রাকিবের কাছে রেখে দিলাম উল্টো দৌড়। গিয়ে দেখি এয়ারপোর্টের একজন স্টাফ এক চাইনিজকে আমার ব্যাগটা সেধে দিয়ে দিচ্ছে।

সেই চাইনিজ সুন্দর করে নিজের মনে করে ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করেছে! আমি গিয়ে বললাম- এটা আমার ব্যাগ। সে থতমতো খেয়ে ব্যাগটা আমাকে দিয়ে দ্রুত চলে গেলো। আমি ব্যাগটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। কারন ব্যাগে ছিলো আমাদের তিনজনের পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস। সেদিন ব্যাগ হারিয়ে গেলে কি বিপদে পরতাম ভাবলেই এখনও বুক কাঁপে।

যাক ভালোয় ভালোয় ইতালির রোম এয়ারপোর্টে এসে নামলাম। অদ্ভুত একটা অনুভূতি। আমরা লাগেজের জন্য অপেক্ষ করছি। নাবিল ঘুমিয়ে উঠে একদম ফ্রেশ। আমাদের আশেপাশে দৌড়াদৌড়ি করছে। হঠাৎ সে চিৎকার করে বলে উঠলো – বাংলাদেশ!

আমরা তো অবাক! ও তখন অল্প অল্প কথা বলতে পারে। কিন্তু দেশের নাম জানা তার কথা না। আর ঐ সময়ে দেশের নামটা এমন ভাবে চিৎকার করে বলাতে আমাদেরও অদ্ভুত আনন্দময় একটা অনুভূতি হয়েছিলো। মনে হয়েছিলো – হাজার হাজার মাইল দুরে ফেলে এসেছি আমার দেশকে। ইচ্ছে করলেই যেখানে চট করে ফিরে যাওয়া যাবে না।

১ Response

  1. সাজেদুল হক says:

    আপনার লেখা পড়ে আমারও প্রথম বিদেশ যাবার অভিজ্ঞতা লিখতে ইচ্ছে করছে। ইনশা-আল্লাহ খুব শীগ্রই লিখব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *