মানুষ বড়ই বিচিত্র এক কলকব্জার কারখানা নিয়ে ঘোরে। এই কারখানার ভেতরে অসংখ্য তারের জাল আর রক্ত চলাচলের ছোট ছোট নহর। আমরা সাধারণত আমাদের শরীরটাকে নিয়ে ভাবি না, যতক্ষণ না সেটি বিদ্রোহ শুরু করে। ধরুন, আপনার ঘাড়ে একটু ব্যথা শুরু হলো। আপনি পাত্তা দিলেন না। তারপর একদিন দেখলেন ব্যথাটা হাত বেয়ে নিচে নেমে আসছে। হাত ঝিনঝিন করছে, অবশ লাগছে। আপনি হয়তো ভাবলেন – এই বুঝি হাড় ক্ষয়ে গেল, কিংবা মস্ত বড় কোনো রোগ হলো!
ভাই সাহেব, সবসময় ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে শরীরের সংকেতগুলো অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই যে ঘাড় থেকে হাতে ব্যথা নামে, এর পেছনে ‘থোরাসিক আউটলেট সিনড্রোম’ নামের এক অদ্ভুত জিনিস থাকতে পারে। নামটা শুনে ভিরমি খাবেন না, এর পেছনের গল্পটা বেশ সহজ।
সেই সরু গলিটা কোথায়?
আমাদের ঘাড়ের ঠিক নিচে, কলার বোন আর প্রথম পাঁজরের মাঝখানে একটা খুব সরু পথ আছে। একে আপনি একটা ‘চিপাগলি’র সাথে তুলনা করতে পারেন। এই চিপাগলি দিয়েই হাতের সব গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু আর রক্তনালিগুলো যাতায়াত করে। কোনো কারণে যদি এই গলিটা আরও সরু হয়ে যায়, তবে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে। আর তখনই শুরু হয় বিপত্তি।
কেন এই গলিটা ছোট হয়ে যায়?
এর অনেকগুলো কারণ আছে। কারো কারো জন্মগতভাবে একটা বাড়তি পাঁজর থাকে – বেচারা হয়তো জানতেই পারল না তার শরীরের ভেতরে একটা বাড়তি হাড় উপদ্রব করছে। আবার কেউ হয়তো সারাদিন ঘাড় কুঁজো করে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে। এই যে আমরা ইদানীং ল্যাপটপে মাথা গুঁজে দুনিয়া খুঁজি, আমাদের শরীর কিন্তু তা মোটেও পছন্দ করে না। এক কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝোলানো কিংবা দীর্ঘক্ষণ হাত ওপরে তুলে কাজ করাও এই রোগের বড় কারণ। এমনকি গর্ভাবস্থায় কিংবা শরীরের ওজন বেড়ে গেলেও এই গলিটা ছোট হয়ে আসতে পারে।
বিপদের সংকেত কী?
লক্ষণগুলো বড়ই বিচিত্র। যদি আপনার স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে, তবে হাত ঝিনঝিন করবে, অবশ লাগবে। মনে হবে হাতের ভেতর কেউ যেন অসংখ্য সুচ ফোটাচ্ছে। হাত দুর্বল হয়ে যাবে, এমনকি চায়ের কাপটা ধরতেও আপনার কষ্ট হবে।
আর যদি রক্তনালির ওপর চাপ পড়ে, তবে হাতটা হুট করে ঠান্ডা হয়ে যাবে। ফ্যাকাসে কিংবা নীলচে রঙ ধারণ করতে পারে। হাত ফুলে যাওয়া কিংবা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়াও বড় সংকেত।
কী করবেন?
জীবনটা আসলে খুব ছোট, এই ছোট জীবনে ব্যথার সাথে বন্ধুত্ব করে লাভ কী? কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে এই সরু গলিটা আবার প্রশস্ত হতে পারে –
১. কম্পিউটারের মনিটরটা আপনার চোখের সমতলে রাখুন। ঘাড় নিচু করে ল্যাপটপ চালানো বন্ধ করুন।
২. টানা বসে থাকবেন না। প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর একটু উঠে দাঁড়ান, ঘাড় আর কাঁধের হালকা ব্যায়াম করুন। আকাশটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও কিন্তু মন্দ হয় না।
৩. এক কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝোলানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন। আমরা তো আর কুলিগিরি করতে আসিনি, তাই না?
৪. শোয়ার সময় খুব বেশি উঁচ বা শক্ত বালিশ ব্যবহার করবেন না। শরীরের সাথে বালিশের একটা ভাব-ভালোবাসা থাকতে হয়।
৫. ওজনটা একটু নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ভুঁড়িটা বাড়লে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
শেষ কথা
ব্যথা যদি না কমে, তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগে নিশ্চিত হওয়া ভালো গন্ডগোলটা ঠিক কোথায়। কখনো কখনো হয়তো ছোট্ট একটা অস্ত্রোপচারের দরকার পড়তে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চললেই সুস্থ থাকা সম্ভব।
বাইরে হয়তো এখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত এক চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।
সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!


