নিশুতি রাতের ভোজ এবং একটি জৈব ঘড়ির আর্তনাদ

মানুষ বড়ই বিচিত্র এক কলকব্জার কারখানা নিয়ে ঘোরে। এই কারখানার ভেতরে একটা অদৃশ্য ঘড়ি আছে, যাকে পণ্ডিতেরা বলেন ‘সার্কাডিয়ান রিদম’। প্রকৃতি এই ঘড়িটা সেট করে দিয়েছে সূর্যের সঙ্গে মিলিয়ে। সূর্য ডুবলে কারখানা বন্ধ হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা আধুনিক মানুষেরা করলাম কী—সূর্য ডোবার পর আমাদের আসল জীবন শুরু করলাম। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মানুষেরা। জ্যাম ঠেলে রাত দশটায় বাড়ি ফিরে, এগারোটা-বারোটায় মস্ত বড় এক ভোজ দিয়ে আমরা ভাবি—জীবন তো বেশ চলছে!

ভাই সাহেব, জীবন চলছে না, জীবন আসলে বিপথে যাচ্ছে। এই যে গভীর রাতে খাওয়া আর অসময়ে ঘুম—এটা আমাদের শরীরে এক অদ্ভুত ত্রিমাত্রিক সংকট তৈরি করছে।

রাত জাগা পাখির ক্ষুধা
রাত দশটার পর যখন আপনি ভারী খাবার খান, আপনার শরীর তখন ভীষণ অবাক হয়। সে তখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, অথচ আপনি তার ওপর চাপিয়ে দিলেন এক গাদা ক্যালরি। রাতের বেলা শরীরের বিপাকীয় ক্ষমতা বা মেটাবলিজম থাকে একদম তলানিতে। দিনের বেলা যে খাবার খেলে শক্তি হতো, রাতে সেই একই খাবার হয়ে যায় চর্বি। শরীর তখন অলসভাবে সেই চর্বিগুলো পেটের আশেপাশে জমা করতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা রাত দশটার পর ডিনার করেন, তাদের ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

ঘুম এবং হরমোনের লুকোচুরি
ভারী খাবার খেয়ে যখন আপনি বিছানায় যান, তখন আপনার পাকস্থলী কিন্তু ঘুমায় না। সে তখন অক্লান্ত পরিশ্রম করে খাবার হজম করার চেষ্টা করছে। ফলে আপনার ঘুমটা গভীর হয় না। আপনি হয়তো সাত ঘণ্টা বিছানায় পড়ে থাকলেন, কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক আর শরীর ঠিকমতো বিশ্রাম পেল না।

এর ফল কী হয় জানেন? শরীরে ‘লেপটিন’ আর ‘ঘ্রেলিন’ নামের দুটো হরমোন আছে। তারা তখন ক্ষেপে যায়। ঘুমের অভাবে লেপটিন কমে যায় আর ঘ্রেলিন বেড়ে যায়। ফলে পরদিন আপনার প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগে, মনটা কেবল মিষ্টি আর ভাজাপোড়া খাবারের জন্য হাহাকার করে। শুরু হয় এক দুষ্টচক্র—অসময়ে খাওয়া, আধো-আধো ঘুম আর দিন দিন বাড়তে থাকা স্থূলতা বা মেদ।

সমাধানের সহজ টোটকা
জীবনটা আসলে খুব ছোট। এই ছোট জীবনে অকালে বুড়ো হয়ে যাওয়া কিংবা রোগে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। সমাধান খুব আহামরি কিছু নয়, মাত্র চারটা কাজ করলেই কেল্লাফতে—
১. রাতের খাবারটা সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটার মধ্যে সেরে ফেলুন।
২. খাবারটা হোক খুব হালকা। রাজকীয় ভোজটা বরং লাঞ্চের জন্য তুলে রাখুন।
৩. ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ওই জাদুকরী বাক্সটি (স্মার্টফোন) দূরে সরিয়ে রাখুন।
৪. প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমান।

শেষ কথা
প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কেউ কোনোদিন জিততে পারেনি। আমরা যখন রাত জেগে মুঠোফোনে নীল আলো দেখি আর পিৎজা-বার্গার চিবোই, প্রকৃতি তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে। স্থূলতা কেবল দেখার সৌন্দর্য নষ্ট করে না, এটি ভেতর থেকে আমাদের নিঃশব্দে ক্ষয় করে দেয়।

বাইরে হয়তো এখন ঝিঁঝিঁ ডাকছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দটা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে আজই একটু জলদি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন না!

শরীরটাকে একটু মায়া করুন। এই যন্ত্রটি একবার বিকল হলে সারা দুনিয়া দিয়েও কিন্তু সারানো যাবে না।

সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!

হাঁটার সময় বেখেয়াল হয়ে পড়ছেন না তো?

মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। সে অন্যের মৃত্যু দেখে কাঁদে, খবরের কাগজে শোকসংবাদ পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আবার পরক্ষণেই সব ভুলে গিয়ে সেই একই বিপজ্জনক খানাখন্দের পাশ দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে যায়। আমাদের স্মৃতি বড়ই স্বল্পস্থায়ী। সেই যে শিশুটি মায়ের কোল থেকে হুট করে এক অন্ধকার গর্তে হারিয়ে গেল, কিংবা সেই মা – যিনি জমে থাকা বৃষ্টির পানির নিচে খোলা ম্যানহোলটি দেখতে পাননি – তাদের কথা আমরা কজন মনে রেখেছি? যারা প্রিয়জনকে হারিয়েছে, কেবল তারাই বুকের ভেতর কষ্টের এক প্রচণ্ড ভারী পাথর বয়ে বেড়ায়। বাকিরা আমরা ‘সাবধানে থেকো’ বলে আবার বেখেয়াল হয়ে পড়ি।

চেনা গর্ত এবং এক অজানা মৃত্যুপুরী
ধরুন, আপনার প্রতিদিনের চলার পথে একখানা ছোট গর্ত আছে। দেখতে দেখতে আপনি গর্তটাকে নিজের ঘরের আসবাবপত্রের মতো চিনে গেছেন। আপনি জানেন ঠিক কোথায় পা ফেললে বিপদ হবে না। কিন্তু একদিন হয়তো খুব তাড়াহুড়ো, কিংবা মনটা খুব খারাপ – হুট করে ওই চেনা গর্তেই আপনি পা পিছলে পড়ে গেলেন।

গর্ত দেখতে সাধারণ হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে বিষাক্ত গ্যাস কিংবা অক্সিজেনের অভাব। ওটা আসলে এক জাদুকরী মৃত্যুপুরী। সেখান থেকে কেউ কেউ হয়তো ফিরে আসে, কিন্তু অনেকের হাড়গোড় কিংবা মস্তিষ্ক এমনভাবে চোট পায় যে বাকি জীবনটা হয়ে ওঠে এক বিষাদময় বোঝা।

রাস্তার যত মায়াবী ফাঁদ
রাস্তা মানেই যে শুধু গর্তের ভয়, তা কিন্তু নয়। রোদ ঝলমলে দিনে হঠাৎ দেখলেন রাস্তায় পানি জমে আছে। আপনি ভাবলেন পা ডুবিয়ে হাঁটাটা বেশ আনন্দের। অথচ আপনি জানেন না, সেই পানির নিচে হয়তো কোনো একটা বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে আছে। এক নিমিষেই আপনার জীবনপ্রদীপ নিভে যেতে পারে।

আবার অনেক সময় আমরা যখন আকাশের মেঘ দেখি, তখন ভুলে যাই মাথার ওপর নির্মাণাধীন ভবন থেকে একটা ইটের টুকরো পড়তে পারে। কিংবা পেছনের দিক থেকে বেপরোয়া গতির কোনো যমদূত (যাকে আমরা মোটর সাইকেল বা বাস বলি) আপনাকে ধাক্কা দিতে পারে।

বেখেয়াল হওয়ার এক অদ্ভুত অসুখ
আমরা এখন আর চলার সময় চারপাশটা দেখি না। কানে হেডফোন গুঁজে আমরা কোনো এক সুরের নেশায় মগ্ন থাকি। কিংবা ফোনের ওপাশে থাকা কোনো এক ছায়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হয়ে যাই। আমরা যখন রাস্তা পার হই, তখন আমাদের চোখ থাকে ফোনের পর্দায়, ট্রাফিক আইনের দিকে নয়।

ভাই সাহেব, জীবনটা তো আর সিনেমার রিল নয় যে পরিচালক বললে আবার নতুন করে শুটিং শুরু হবে। জীবন একবারই পাওয়া যায়।

শেষ কথা
জীবনটা আসলে খুব ছোট। এই ছোট জীবনে তাড়াহুড়া করে আমরা কোথায় যাব? গন্তব্য তো সবারই এক। তাই একটু সময় নিয়ে রওনা দিন। রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোনের ওপাশের মানুষটাকে বলুন, “আমি রাস্তা পার হচ্ছি, পরে কথা বলছি।” সাথে যদি কোনো শিশু থাকে, গর্ভবতী নারী কিংবা কোনো বয়োবৃদ্ধ মানুষ থাকে—তবে তাদের হাতটা শক্ত করে ধরুন। এই মায়ার বন্ধনটুকুই তো আমাদের বড় সম্পদ।

নিজের এলাকায় যদি দেখেন কোনো ম্যানহোল খোলা পড়ে আছে কিংবা কোনো বিদ্যুতের তার বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে, তবে সেটাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেবেন না। দশজন মিলে সমাধান করুন, প্রয়োজনে প্রশাসনের সাহায্য নিন।

বাইরে হয়তো এখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।

সাবধানে হাঁটুন। আপনার অপেক্ষায় বাড়িতে কেউ একজন জানালার পাশে বসে আছে। তার কাছে সুস্থভাবে ফিরে যাওয়াই হোক আপনার আজকের সার্থকতা। শুভকামনা!

ঘাড় থেকে হাতে ব্যথা কেন হয়, হলে কী করবেন

মানুষ বড়ই বিচিত্র এক কলকব্জার কারখানা নিয়ে ঘোরে। এই কারখানার ভেতরে অসংখ্য তারের জাল আর রক্ত চলাচলের ছোট ছোট নহর। আমরা সাধারণত আমাদের শরীরটাকে নিয়ে ভাবি না, যতক্ষণ না সেটি বিদ্রোহ শুরু করে। ধরুন, আপনার ঘাড়ে একটু ব্যথা শুরু হলো। আপনি পাত্তা দিলেন না। তারপর একদিন দেখলেন ব্যথাটা হাত বেয়ে নিচে নেমে আসছে। হাত ঝিনঝিন করছে, অবশ লাগছে। আপনি হয়তো ভাবলেন – এই বুঝি হাড় ক্ষয়ে গেল, কিংবা মস্ত বড় কোনো রোগ হলো!

ভাই সাহেব, সবসময় ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে শরীরের সংকেতগুলো অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই যে ঘাড় থেকে হাতে ব্যথা নামে, এর পেছনে ‘থোরাসিক আউটলেট সিনড্রোম’ নামের এক অদ্ভুত জিনিস থাকতে পারে। নামটা শুনে ভিরমি খাবেন না, এর পেছনের গল্পটা বেশ সহজ।

সেই সরু গলিটা কোথায়?
আমাদের ঘাড়ের ঠিক নিচে, কলার বোন আর প্রথম পাঁজরের মাঝখানে একটা খুব সরু পথ আছে। একে আপনি একটা ‘চিপাগলি’র সাথে তুলনা করতে পারেন। এই চিপাগলি দিয়েই হাতের সব গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু আর রক্তনালিগুলো যাতায়াত করে। কোনো কারণে যদি এই গলিটা আরও সরু হয়ে যায়, তবে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে। আর তখনই শুরু হয় বিপত্তি।

কেন এই গলিটা ছোট হয়ে যায়?
এর অনেকগুলো কারণ আছে। কারো কারো জন্মগতভাবে একটা বাড়তি পাঁজর থাকে – বেচারা হয়তো জানতেই পারল না তার শরীরের ভেতরে একটা বাড়তি হাড় উপদ্রব করছে। আবার কেউ হয়তো সারাদিন ঘাড় কুঁজো করে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে। এই যে আমরা ইদানীং ল্যাপটপে মাথা গুঁজে দুনিয়া খুঁজি, আমাদের শরীর কিন্তু তা মোটেও পছন্দ করে না। এক কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝোলানো কিংবা দীর্ঘক্ষণ হাত ওপরে তুলে কাজ করাও এই রোগের বড় কারণ। এমনকি গর্ভাবস্থায় কিংবা শরীরের ওজন বেড়ে গেলেও এই গলিটা ছোট হয়ে আসতে পারে।

বিপদের সংকেত কী?
লক্ষণগুলো বড়ই বিচিত্র। যদি আপনার স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে, তবে হাত ঝিনঝিন করবে, অবশ লাগবে। মনে হবে হাতের ভেতর কেউ যেন অসংখ্য সুচ ফোটাচ্ছে। হাত দুর্বল হয়ে যাবে, এমনকি চায়ের কাপটা ধরতেও আপনার কষ্ট হবে।

আর যদি রক্তনালির ওপর চাপ পড়ে, তবে হাতটা হুট করে ঠান্ডা হয়ে যাবে। ফ্যাকাসে কিংবা নীলচে রঙ ধারণ করতে পারে। হাত ফুলে যাওয়া কিংবা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়াও বড় সংকেত।

কী করবেন?
জীবনটা আসলে খুব ছোট, এই ছোট জীবনে ব্যথার সাথে বন্ধুত্ব করে লাভ কী? কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে এই সরু গলিটা আবার প্রশস্ত হতে পারে –
১. কম্পিউটারের মনিটরটা আপনার চোখের সমতলে রাখুন। ঘাড় নিচু করে ল্যাপটপ চালানো বন্ধ করুন।
২. টানা বসে থাকবেন না। প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর একটু উঠে দাঁড়ান, ঘাড় আর কাঁধের হালকা ব্যায়াম করুন। আকাশটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও কিন্তু মন্দ হয় না।
৩. এক কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝোলানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন। আমরা তো আর কুলিগিরি করতে আসিনি, তাই না?
৪. শোয়ার সময় খুব বেশি উঁচ বা শক্ত বালিশ ব্যবহার করবেন না। শরীরের সাথে বালিশের একটা ভাব-ভালোবাসা থাকতে হয়।
৫. ওজনটা একটু নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ভুঁড়িটা বাড়লে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

শেষ কথা
ব্যথা যদি না কমে, তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগে নিশ্চিত হওয়া ভালো গন্ডগোলটা ঠিক কোথায়। কখনো কখনো হয়তো ছোট্ট একটা অস্ত্রোপচারের দরকার পড়তে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চললেই সুস্থ থাকা সম্ভব।

বাইরে হয়তো এখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত এক চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।

সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!

জন্ডিস থেকে কখন লিভার ফেইলিউর হতে পারে

মানুষের শরীরটা বড়ই রহস্যময় এক কলকব্জার কারখানা। এই কারখানাটি নিঃশব্দে তার কাজ করে যায়। কিন্তু হুট করে একদিন সকালে আয়নায় তাকিয়ে দেখলেন – আপনার চোখ দুটো পদ্মফুলের পাপড়ির মতো সাদা না থেকে কেমন জানি হলদেটে হয়ে গেছে। নখগুলোও ফ্যাকাসে হলুদ। আমাদের চেনা-জানার পরিভাষায় আমরা একে বলি ‘জন্ডিস’।

জন্ডিস কোনো অসুখ নয়, জন্ডিস হলো একটা সংকেত। আমাদের রক্তে ‘বিলিরুবিন’ নামের এক হলুদ পদার্থের পরিমাণ যখন বেড়ে যায়, তখনই শরীর এমন বর্ণ ধারণ করে। জন্ডিস হওয়া মানেই যে আপনি যমালয়ে যাত্রা করবেন, তা কিন্তু নয়। তবে এই জন্ডিসই কখনো কখনো ‘লিভার ফেইলিউর’-এর মতো ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।

কেন এমন হয়?
জন্ডিস মূলত তিনটি কারণে হয়। কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ (যেমন হেপাটাইটিস এ, বি বা সি), লিভারের কোষের ক্ষতি (অ্যালকোহল বা উল্টোপাল্টা ওষুধের কারণে), অথবা পিত্তনালিতে পাথর বা টিউমারের বাধা।

ভাইরাল জন্ডিস – বিশেষ করে হেপাটাইটিস এ বা ই – বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৃষ্টির মতো আসে, আবার আকাশ পরিষ্কার করে চলে যায়। কিন্তু কালবৈশাখী হয়ে আসে হেপাটাইটিস বি আর সি। এরা বড়ই ছদ্মবেশী। হয়তো আপনার জন্ডিস সেরে গেছে, কিন্তু ভাইরাসটি লিভারের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। কয়েক বছর পর সে যখন জেগে ওঠে, তখন লিভার তার কাজ করার ক্ষমতা হারায়। একেই ডাক্তাররা বলেন ‘লিভার ফেইলিউর’।

বিপদের হাতছানি
লিভার বড়ই মুখচোরা অঙ্গ। সে অনেক কষ্ট সহ্য করতে পারে। কিন্তু যখন সে আর পারে না, তখন কিছু সংকেত দেয়। জন্ডিসের সাথে যদি নিচের এই লক্ষণগুলো দেখেন, তবে জানবেন বড় বিপদ দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে –
১. প্রচণ্ড দুর্বলতা আর সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব।
২. পেটটা হুট করে ঢাকের মতো ফুলে ওঠা।
৩. রক্তবমি বা পায়খানার রং কালো হওয়া।
৪. কথা বলতে অসুবিধা হওয়া কিংবা মানুষকে চিনতে না পারা।

ভাই সাহেব, এমন সময় ঝাড়ফুঁক কিংবা কবিরাজি পানিপড়া নিয়ে বসে থাকলে কিন্তু চলবে না। জীবনটা বড়ই অনিশ্চিত, মিছেমিছি ঝুঁকি বাড়িয়ে লাভ কী?

একটু সতর্কতা, এক চিলতে হাসি
জীবনটা আসলে খুব সুন্দর। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা। জন্ডিস থেকে বাঁচতে খুব কঠিন কিছু করতে হয় না। বিশুদ্ধ পানি পান করুন, বাইরের খোলা খাবার খাবেন না, আর হেপাটাইটিস বি-এর টিকাটা সময়মতো নিয়ে নিন। আর হ্যাঁ, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে কিনে কোনো ‘জাদুকরী’ ওষুধ খাবেন না – লিভার হয়তো ওই ওষুধটা একদম পছন্দ করবে না।

সব জন্ডিসই বিপজ্জনক নয়, কিন্তু অবহেলা করলে সামান্য ঝিরঝিরে বৃষ্টিও বন্যা হয়ে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিতে পারে।

বাইরে হয়তো আকাশটা নীল, কিংবা কোথাও এক চিলতে রোদ খেলা করছে। এই রোদে ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার নামই জীবন। সেই জীবনকে ভালোবাসুন। শরীরটাকে অবহেলা করবেন না।

সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!

লিভারের কান্না এবং আমাদের রসনা বিলাস

আকাশটা মেঘলা। এমন দিনে জানালার পাশে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর দুটো মুচমুচে বেগুনি হলে মন্দ হতো না। কিন্তু মুশকিল হলো, আমাদের এই অতি আদরের শরীরটা ভাজাপোড়া খুব একটা পছন্দ করে না। বিশেষ করে ‘লিভার’ নামের ওই বেচারা যন্ত্রটি। আমরা তাকে সারাদিন নানা রকম তেল-চর্বি দিয়ে জ্বালাতন করি, আর সে নীরবে সহ্য করে যায়। সহ্য করতে করতে যখন তার দেওয়ালে ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি চর্বি জমে যায়, তখন ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে বলেন – ‘আপনার ফ্যাটি লিভার হয়েছে।’

ভাই সাহেব, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা মানে হলো এক বড় বিপদের হাতছানি। এই চর্বি জমে লিভারে প্রদাহ হতে পারে, এমনকি লিভার ফেইলিউর পর্যন্ত হতে পারে। চলুন, আজ এই চর্বি তাড়ানোর কিছু সহজ টোটকা নিয়ে গল্প করি।

দুই ধরণের আপদ
ডাক্তাররা ফ্যাটি লিভারকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একটি হলো যারা মদ্যপান করেন – তাদের জন্য। এটি বেশ ভয়ানক। অন্যটি হলো ‘নন-অ্যালকোহলিক’ – যা মূলত আমাদের মতো সাধারণ মানুষের হয়। অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, স্থূলতা আর ডায়াবেটিস হলো এর প্রধান কারণ। আমরা খাচ্ছি বেশি, কিন্তু নড়াচড়া করছি কম। ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

কী খাবেন আর কী ছাড়বেন?
লিভারের চর্বি কমাতে হলে চিনি আর সাদা শর্করাকে একটু দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। ইনসুলিন নামের রাজপুত্র যখন শরীরে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, তখনই লিভারে চর্বি জমা শুরু হয়। তাই পাতে রাখুন শাকসবজি, শিম, ডাল আর গোটা ফল। তেলের বদলে জলপাই তেল বা অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে।

লিভারের পরম বন্ধু যারা
কিছু কিছু খাবার আছে যারা লিভারের জন্য আশীর্বাদের মতো। আসুন চিনে নেই তাদের:

১. হলুদ: এটি শুধু তরকারির মসলা নয়, এটি এক জাদুকরী জিনিস। হলুদ চর্বি হজম করতে সাহায্য করে এবং লিভারে চর্বি জমতে বাধা দেয়।
২. লেবু: লেবুতে আছে ভিটামিন সি। এটি লিভারকে বিষমুক্ত বা ডিটক্স করতে সাহায্য করে। লেবুর ভেতরের ‘নারিঞ্জেনিন’ নামক উপাদানটি লিভারের প্রদাহ কমায়। সকালে এক গ্লাস লেবু পানি খেলে মন্দ হয় না।
৩. গ্রিন টি: আপনি যদি চায়ের নেশাগ্রস্ত হন, তবে গ্রিন টি বেছে নিন। এটি ব্যাকটেরিয়া দূর করে এবং চর্বি পোড়াতে সাহায্য করে। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায়।
৪. পেঁপে: পেঁপের ফল আর বীজ দুটোই চর্বি পোড়ানোর জন্য চমৎকার। ফ্যাটি লিভারের রোগীদের জন্য এটি মহৌষধ।
৫. চর্বিহীন প্রোটিন: চর্বি ছাড়া মুরগি, সামুদ্রিক মাছ, ডিম আর সয়া জাতীয় খাবার ওজনে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
৬. দুগ্ধজাত খাবার: চর্বিছাড়া দুধ, টক দই বা পনির নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। এতে লিভারের ওপর চাপ কম পড়ে।

শেষ কথা:

জীবনটা বড়ই ছোট। এই ছোট জীবনে সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা। আমরা অবেলায় ভাজাপোড়া খাই, শরীরকে অবহেলা করি আর ভাবি আমরা খুব ভালো আছি। কিন্তু শরীর তো কথা বলতে পারে না, সে তার কষ্টগুলো জমা করে রাখে।

বাইরে হয়তো এখন বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে আরও কিছুটা দিন বেঁচে থাকা কি খুব বেশি চাওয়া? একটু সাবধানে খান, একটু নিয়ম মেনে চলুন। দেখবেন আপনার লিভার আর কাঁদছে না, সে বরং আপনাকে এক প্রশান্তির হাসি উপহার দিচ্ছে।

সাবধানে থাকবেন। আপনার শরীরের সাথে মায়ায় জড়ান, দেখবেন পৃথিবীটা আরও সুন্দর লাগছে। শুভকামনা!

শরীরের ভেতরকার লুকোচুরি: ডায়াবেটিস এবং ফ্যাটি লিভারের গল্প

আমাদের এই দেহটা বড়ই বিচিত্র এক কলকব্জার কারখানা। আমরা ভাবি লিভার তার নিজের মতো কাজ করছে, আর অগ্ন্যাশয় তার নিজের মতো। অথচ শরীরের ভেতর এরা একে অপরের কানে কানে সারাক্ষণ গোপন কথা বলে। ইদানীং আমাদের দেশে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ফ্যাটি লিভার বা কলিজায় চর্বি জমার উপদ্রব খুব বেড়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর গালভরা নাম –  ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’ বা এমএএসএলডি। নামটা শুনে ভিরমি খাওয়ার কিছু নেই, এর আসল রহস্যটা কিন্তু খুব সরল।

ইনসুলিন যখন অবাধ্য হয়
ডায়াবেটিস আর ফ্যাটি লিভার – দেখতে আলাদা মনে হলেও এদের জন্ম আসলে একই উৎস থেকে। এর নাম ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’। ধরুন, ইনসুলিন হলো একটা চাবি, যা রক্ত থেকে গ্লুকোজকে ঘরের (কোষের) ভেতর ঢোকাবে। কিন্তু কোনো কারণে চাবিটা যখন তালা খুলতে পারে না, তখন রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায় – যাকে আমরা বলি ডায়াবেটিস। আর ঠিক একই সময়ে ওই অবাধ্য ইনসুলিনের কারণে লিভারেও চর্বি জমতে শুরু করে।

ভাই সাহেব, মজার ব্যাপার হলো – যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ জনেরই লিভারে চর্বি জমে থাকে। এরা অনেকটা যমজ ভাইয়ের মতো, একজন এলে অন্যজনও পেছন পেছন চলে আসে। বিশেষ করে আমাদের মতো যাদের ভুঁড়িটা একটু বেড়েছে, তাদের বেলায় এরা খুব বেশি ভাব জমায়।

নীরব ঘাতকের আনাগোনা
ফ্যাটি লিভারের বড় সমস্যা হলো, সে কোনো আওয়াজ করে আসে না। সে হলো এক নীরব আগন্তুক। শরীর খুব একটা খারাপ লাগে না, মাঝে মাঝে একটু ক্লান্তি বা পেটের ডান দিকে একটু ভার ভার ঠেকতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে লিভারের বারোটা বাজিয়ে দেয়। প্রদাহ বাড়তে থাকে, আর অবহেলা করলে তা লিভার সিরোসিস বা ক্যানসারের মতো ভয়ঙ্কর দিকে মোড় নিতে পারে। ডায়াবেটিস এমনিতে হার্ট বা কিডনির ক্ষতি করে, তার ওপর ফ্যাটি লিভার সঙ্গী হলে বিপদটা ডাবল হয়ে যায়।

আয়নায় লিভার দেখা
এখন প্রশ্ন হলো, বুঝবেন কীভাবে? লিভার তো আর আয়নায় দেখা যায় না। এর জন্য আলট্রাসনোগ্রাফি আর রক্তের কয়েকটা পরীক্ষা (এএলটি বা এএসটি) করলেই আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। আমার পরামর্শ হলো, যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা বছরে অন্তত একবার লিভারটা পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। সাবধানের মার নেই!

মুক্তির উপায়: একটু হাঁটাচলা আর সবুজ পাতা
ডায়াবেটিস আর ফ্যাটি লিভার – দুটোই কিন্তু আপনার জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি আপনার বর্তমান ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারেন, তবে এই দুই আপদই লেজ গুটিয়ে পালাবে।

সহজ কিছু নিয়ম মেনে দেখুন না –
১. প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ঘাম ঝরিয়ে হাঁটুন। খোলা আকাশের নিচে হাঁটলে মনের সাথে শরীরটাও সজীব হয়।
২. মিষ্টি আর তেল-চর্বিওয়ালা ভাজাপোড়া খাবারগুলোকে একটু দূরে সরিয়ে রাখুন।
৩. পাতে বেশি করে সবুজ শাকসবজি আর ফলমূল রাখুন।

জীবনটা আসলে খুব ছোট। এই ছোট জীবনে অবহেলা করে শরীরটাকে নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, নিয়ম মেনে চলুন। দেখবেন, আপনার অবাধ্য ইনসুলিন আবার বাধ্য হয়ে গেছে আর লিভারের চর্বিও কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।

বাইরে হয়তো আকাশটা মেঘলা, কিংবা কোথাও এক চিলতে রোদ। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।

সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!