মানুষের শরীরটা বড়ই রহস্যময় এক কলকব্জার কারখানা। এই কারখানাটি নিঃশব্দে তার কাজ করে যায়। কিন্তু হুট করে একদিন সকালে আয়নায় তাকিয়ে দেখলেন – আপনার চোখ দুটো পদ্মফুলের পাপড়ির মতো সাদা না থেকে কেমন জানি হলদেটে হয়ে গেছে। নখগুলোও ফ্যাকাসে হলুদ। আমাদের চেনা-জানার পরিভাষায় আমরা একে বলি ‘জন্ডিস’।

জন্ডিস কোনো অসুখ নয়, জন্ডিস হলো একটা সংকেত। আমাদের রক্তে ‘বিলিরুবিন’ নামের এক হলুদ পদার্থের পরিমাণ যখন বেড়ে যায়, তখনই শরীর এমন বর্ণ ধারণ করে। জন্ডিস হওয়া মানেই যে আপনি যমালয়ে যাত্রা করবেন, তা কিন্তু নয়। তবে এই জন্ডিসই কখনো কখনো ‘লিভার ফেইলিউর’-এর মতো ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।

কেন এমন হয়?
জন্ডিস মূলত তিনটি কারণে হয়। কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ (যেমন হেপাটাইটিস এ, বি বা সি), লিভারের কোষের ক্ষতি (অ্যালকোহল বা উল্টোপাল্টা ওষুধের কারণে), অথবা পিত্তনালিতে পাথর বা টিউমারের বাধা।

ভাইরাল জন্ডিস – বিশেষ করে হেপাটাইটিস এ বা ই – বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৃষ্টির মতো আসে, আবার আকাশ পরিষ্কার করে চলে যায়। কিন্তু কালবৈশাখী হয়ে আসে হেপাটাইটিস বি আর সি। এরা বড়ই ছদ্মবেশী। হয়তো আপনার জন্ডিস সেরে গেছে, কিন্তু ভাইরাসটি লিভারের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। কয়েক বছর পর সে যখন জেগে ওঠে, তখন লিভার তার কাজ করার ক্ষমতা হারায়। একেই ডাক্তাররা বলেন ‘লিভার ফেইলিউর’।

বিপদের হাতছানি
লিভার বড়ই মুখচোরা অঙ্গ। সে অনেক কষ্ট সহ্য করতে পারে। কিন্তু যখন সে আর পারে না, তখন কিছু সংকেত দেয়। জন্ডিসের সাথে যদি নিচের এই লক্ষণগুলো দেখেন, তবে জানবেন বড় বিপদ দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে –
১. প্রচণ্ড দুর্বলতা আর সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব।
২. পেটটা হুট করে ঢাকের মতো ফুলে ওঠা।
৩. রক্তবমি বা পায়খানার রং কালো হওয়া।
৪. কথা বলতে অসুবিধা হওয়া কিংবা মানুষকে চিনতে না পারা।

ভাই সাহেব, এমন সময় ঝাড়ফুঁক কিংবা কবিরাজি পানিপড়া নিয়ে বসে থাকলে কিন্তু চলবে না। জীবনটা বড়ই অনিশ্চিত, মিছেমিছি ঝুঁকি বাড়িয়ে লাভ কী?

একটু সতর্কতা, এক চিলতে হাসি
জীবনটা আসলে খুব সুন্দর। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা। জন্ডিস থেকে বাঁচতে খুব কঠিন কিছু করতে হয় না। বিশুদ্ধ পানি পান করুন, বাইরের খোলা খাবার খাবেন না, আর হেপাটাইটিস বি-এর টিকাটা সময়মতো নিয়ে নিন। আর হ্যাঁ, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে কিনে কোনো ‘জাদুকরী’ ওষুধ খাবেন না – লিভার হয়তো ওই ওষুধটা একদম পছন্দ করবে না।

সব জন্ডিসই বিপজ্জনক নয়, কিন্তু অবহেলা করলে সামান্য ঝিরঝিরে বৃষ্টিও বন্যা হয়ে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিতে পারে।

বাইরে হয়তো আকাশটা নীল, কিংবা কোথাও এক চিলতে রোদ খেলা করছে। এই রোদে ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার নামই জীবন। সেই জীবনকে ভালোবাসুন। শরীরটাকে অবহেলা করবেন না।

সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!