মানুষ বড়ই বিচিত্র প্রাণী। তার ওড়ার কোনো ডানা নেই, অথচ আকাশের বুক চিরে উড়ে বেড়ানোর শখ তার প্রবল। যখন আমরা কয়েক হাজার ফুট ওপরে একখানা লোহার বাক্সে চড়ে বসি, তখন মেঘেদের খুব কাছ থেকে দেখা যায়। এই দেখতে দেখতে হুট করে যখন বিমানটা কেঁপে ওঠে, তখন আমাদের বুকটাও দপ করে ওঠে। আমরা ভাবি – এই বুঝি শেষ! এবার বুঝি বিমানটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে কোনো গভীর জঙ্গলে পড়বে।
ভাই সাহেব, অত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বিমান যখন কাঁপে, তখন জানবেন আকাশের একটু শরীর খারাপ করেছে। একেই বলে ‘টার্বুলেন্স’।
আকাশের অস্থিরতা
টার্বুলেন্স জিনিসটা আসলে কী? ধরুন, আপনি একখানা শান্ত নদীতে নৌকা নিয়ে যাচ্ছেন। হুট করে একটা ঢেউ এল আর আপনার নৌকাটা দুলতে শুরু করল। আকাশের বাতাসও মাঝে মাঝে এমন অস্থির হয়ে ওঠে। বাতাস যখন হুট করে দিক আর গতি বদলে ফেলে, তখন তার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বিমানটা একটু থরথর করে কাঁপে। পাইলট সাহেবরা অবশ্য আগে থেকেই বুঝতে পারেন মেঘের ভেতর কোথাও রাগ জমে আছে কি না। সেই রাগমাখা মেঘের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা আগেভাগেই সংকেত দিয়ে দেন।
তবে ‘ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স’ নামে একটা অদ্ভুত জিনিস আছে। আকাশ একদম ঝকঝকে নীল, অথচ হুট করে বিমানটা এমন ঝাঁকুনি দিল যে আপনার কোল থেকে কফির কাপটা উড়ে গেল। এই দস্যি বাতাসকে আগে থেকে চেনা বড় কঠিন।
লোহার বাক্সের ক্ষমতা
আপনি হয়তো ভাবছেন, এই বিশাল লোহার পাখিটা কি এই ঝাঁকুনি সইতে পারবে? শুনুন, যারা এই বিমান বানিয়েছেন, তারা অত্যন্ত চতুর লোক। তারা বিমানকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যে এটি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি চাপ সইতে পারে। টার্বুলেন্সে বিমান ভেঙে পড়ার ঘটনা জোনাকি পোকার দিনে রোদে পোড়ার মতোই বিরল। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন পাইলটরা আকাশের মেজাজ-মর্জি অনেক আগে থেকেই টের পান।
ভয় তাড়ানোর কিছু টোটকা
১. সিটবেল্টের মায়া: আপনি যখন সিটে বসবেন, সিটবেল্টটা ঢিলেঢালা করে হলেও বেঁধে রাখুন। মেঘবালিকা কখন খেপে গিয়ে ঝাঁকুনি দেবে, কেউ জানে না। সিটবেল্ট বাঁধা থাকলে আপনার মাথাটা অন্তত ওপরের বাক্সে গিয়ে ধাক্কা খাবে না।
২. পেছনের আসন বনাম সামনের আসন: আপনি যদি একটু ভিতু স্বভাবের হন, তবে বিমানের পেছনের দিকে বসবেন না। হিদার পুল নামে এক অভিজ্ঞ নারী, যিনি দীর্ঘ ২১ বছর আকাশপথে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তিনি বলেছেন – বিমানের পেছনের অংশটা দুলন্ত ষাঁড়ের পিঠের মতো বেশি নড়াচড়া করে। সবচেয়ে শান্ত জায়গা হলো ককপিট বা বিমানের সামনের দিক।
৩. সকালবেলাকার যাত্রা: রোদ যখন কড়া হয়, তখন বাতাসও বেশি চঞ্চল হয়। তাই চেষ্টা করবেন সকালের দিকের ফ্লাইটে উঠতে। তখন আকাশটা একটু ঘুমকাতুরে আর শান্ত থাকে।
কেবিন ক্রুদের সঙ্গে সদ্ভাব
আপনার যদি বিমান ভ্রমণে খুব ভয় লাগে, তবে কেবিন ক্রু বা বিমানবালাদের আগেভাগেই জানিয়ে রাখুন। তারা খুব মমতা নিয়ে আপনার দেখাশোনা করবেন। আর হ্যাঁ, বিমান যখন কাঁপছে, তখন হুট করে কোলের বাচ্চাকে অন্য কারো কাছে দেওয়া বা ক্রুদের হাতে গরম কফির কাপ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। বিপদ তাতে বাড়তে পারে।
আজকাল ‘মাই রাডার’ নামে মোবাইলে কিছু জাদুকরী অ্যাপ পাওয়া যায়। সেখানে আগে থেকেই দেখা যায় আকাশের অবস্থা কেমন। ভয় পাওয়ার চেয়ে আকাশকে জানা অনেক ভালো।
শেষ কথা
জীবনটা আসলে এক অদ্ভুত টার্বুলেন্স। এখানেও মাঝে মাঝে ঝড় আসে, মন কেঁপে ওঠে। কিন্তু আমরা তো থেমে থাকি না। নীল আকাশটা যেমন বিশাল, আমাদের সাহসটাও তার চেয়ে বড় হওয়া উচিত। ভয়কে দূরে সরিয়ে জানালা দিয়ে মেঘেদের রাজত্ব দেখুন। দেখবেন, এই কাঁপাকাপির মধ্যেও এক ধরণের অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
বাইরে হয়তো মেঘ ডাকছে, কিংবা বিমানটা একটু দুলছে। দুশ্চিন্তা ছাড়ুন, এক কাপ চা নিয়ে আয়েশ করে বসুন। পাইলট সাহেবরা আপনাকে ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছে দেবেন। শুভ যাত্রা!

