আষাঢ় মাসের চরিত্র বোঝা বড় দায়। এই রোদ, তো এই বৃষ্টি। ঠিক যেন অল্পবয়সী কোনো মান-অভিমানী কিশোরী। আমি বিছানায় শুয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে প্রকৃতির এই রূপবদল দেখছিলাম। রোদঝলমলে আকাশটা মুহূর্তেই কেমন যেন মুখ ভার করল। কালো মেঘের আড়ালে সূর্য মামা টুপ করে ডুব দিলেন। টিলায় নিশ্চিন্তে ঘাস খেতে থাকা গোরু দুটো দেখি বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে বড় একটা কাঁঠালগাছের নিচে আশ্রয় নিল।

আমি আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলাম না। বহু প্রতীক্ষিত বৃষ্টির দেখা মিলেছে, তাকে একটু ছুঁয়ে না দেখলে জীবনটাই বৃথা।

শ্রীমঙ্গলে এলে গত কয়েক বছর ধরে আমার ঠিকানা একটাই – শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্ট। এবার অবশ্য এসেছি তাদের আমন্ত্রণে। পরিবেশ দিবস উপলক্ষে তারা ‘জুন ফর গ্রিন’ নামে এক চমৎকার কর্মসূচি পালন করছে। সেখানে আমার মতো এক অধম লেখক ছাড়াও আছেন অ্যান্টার্কটিকা অভিযাত্রী মহুয়া রউফ, বৃক্ষবন্ধু আজহারুল ইসলাম খান আর বন্যপ্রাণী সংরক্ষক মাহফুজ রাসেল। তবে সত্যি বলতে কী, আষাঢ়ের এই ঝুম বৃষ্টিকে উপেক্ষা করার সাধ্য আমার অন্তত নেই।

কিন্তু ২৬ জুন শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নেমে বেশ হতাশই হয়েছিলাম। দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় এমন খটখটে রোদে ঘাম ঝরছে! আমি তখন থেকেই বৃষ্টির অপেক্ষা করছি। অবশেষে মেঘবালিকার মন গলেছে।

দোতলার কাঠের ঘর থেকে ছাতা হাতে নামতে গিয়ে দেখি এক মহাবিপদ। কাঠের সিঁড়িটা একটি কুকুরের প্রিয় আস্তানা। সে বেশ আয়েশ করে সেখানে ঘুমিয়ে আছে। তাকে বিরক্ত না করে পা টিপে টিপে পাশ কাটিয়ে নামলাম। নামতেই টিনের চালে শুরু হলো বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ। পুকুরপাড়ে নানা রঙের ফুলের মেলা। পুকুরের পানিতে অনবরত বৃষ্টির ফোঁটার নাচ। প্রকৃতির এমন বাদ্যের সামনে কি আর ছাতা ধরে রাখা যায়? ছাতা আর মুঠোফোন – দুটোকেই একপাশে সরিয়ে রেখে নিজেকে সঁপে দিলাম বৃষ্টির কাছে।

পাহাড়ের বুক বেয়ে জলধারা নামছে। মাটির সোঁদা গন্ধ নেই ঠিকই, কিন্তু কাদা কাদা মাটিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিভেজা বাতাসের যে ঘ্রাণ – তা কোনো দামী পারফিউমে পাওয়া যাবে না। আমি চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ছোঁয়া নিলাম। মাঝেমধ্যে মেঘের মৃদু ডাক শোনা যাচ্ছে, যেন খুব আদুরে সুরে কেউ ডাকছে।

একসময় বৃষ্টির তেজ কমে এল। ভেজা শরীরে কাঠের ঘরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম একটা কাঠবিড়ালি দৌড়ে এসে টিনের চালের নিচে আশ্রয় নিচ্ছে। তার ভয়াতুর চোখেও এক ধরণের মায়া।

অনেকেই আমায় জিজ্ঞেস করেন, “হুমায়ুন সাহেব, এই রিসোর্টে কোনো টেলিভিশন নেই কেন?” প্রশ্নটা অমূলক নয়। আজকের এই যুগে কোনো রুমে টিভি থাকবে না, এটা ভাবাই যায় না। শান্তিবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা তানভীর আরেফিন লিংকন অবশ্য এর একটা জাদুকরী উত্তর দিয়েছেন। তিনি চান না তাঁর অতিথিরা রুমের চার দেয়ালের ভেতর ‘বোকা বাক্সের’ সামনে বসে সময় কাটাক। তিনি চান মানুষ যেন এখানে এসে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়, গাছের ছায়ায় বসে কাঠবিড়ালির দৌড়ঝাঁপ দেখে কিংবা রাতে বারান্দায় বসে চাঁদের আলোয় গা ভেজায়।

বৃষ্টিভেজা দুপুরে টিনের চালে টুপটুপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে আমারও মনে হলো, টেলিভিশন না থাকাটাই বোধহয় এর সবচেয়ে বড় সার্থকতা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিনেমা তো বাইরেই চলছে – যেখানে কোনো রিটেক নেই, কোনো বিজ্ঞাপন নেই।

হয়তো এ কারণেই শ্রীমঙ্গলের এই কাঠের দোতলা ঘরটা আমাকে বারবার টানে। জীবনটা আসলে খুব ছোট, এই ছোট জীবনে কিছু সময় টিভি না দেখে বৃষ্টির শব্দ শুনে কাটাতে পারলে মন্দ কী!

বাইরে আবার মেঘ ডাকছে। মনে হচ্ছে দ্বিতীয় পর্বের বৃষ্টি নামবে। আমি আরেক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে বারান্দায় বসলাম। টেলিভিশনহীন জীবনটা মন্দ নয়, বরং বেশ মায়াময়।

আপনারা কেমন আছেন? এক কাপ চা খাবেন নাকি?