মকবুল সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। তাঁর ধারণা, ধনী হওয়া মানেই হলো জবরজং পোশাক পরা, গলায় সোনার চেইন ঝোলানো আর দিনরাত টাকার ওপর শুয়ে থাকা। কিন্তু কাগজে যা পড়ছেন, তাতে তাঁর আক্কেল গুড়ুম হওয়ার দশা। দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত ধনীরা আসলে অন্য ধাতুতে গড়া। তাদের এমন কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের মতো সাধারণ মধ্যবিত্তের মাথায় সহজে ঢুকবে না।

আশ্চর্য সেই অভ্যাসগুলোর ফিরিস্তি অনেকটা এরকম:

. সম্পদের মোহ, জিনিসের নয়
আমরা মধ্যবিত্তরা টাকা জমলে ভাবি একটা নতুন মডেলের গাড়ি কিনব কিংবা বসার ঘরের পর্দাটা পাল্টাব। কিন্তু ধনীরা এসব সাজসজ্জার ধার ধারে না। তারা টাকা জমলে খোঁজেন ‘সম্পদ’। অর্থাৎ এমন কিছু যা তাকে ভবিষ্যতে আরও টাকা এনে দেবে- হয়তো শেয়ারবাজারের অংশীদারিত্ব কিংবা এক টুকরো জমি। তারা জিনিস কেনেন না, তারা আসলে টাকা বানানোর মেশিন কেনেন।

. দাবার চাল এবং টাকার খেলা
মকবুল সাহেবের কাছে ব্যাংক মানেই হলো পরম নিরাপদ এক আশ্রয়, যেখানে ফিক্সড ডিপোজিট করে তিনি শান্তিতে ঘুমান। কিন্তু ধনীরা টাকাকে দেখেন দাবার চাল হিসেবে। তারা ঝুঁকি নেন, বাজারের নতুন চাল শেখেন। কোনো চালে হেরে গেলে তারা মুষড়ে পড়েন না, বরং ভাবেন- পরের চালটা কীভাবে দিলে মাত করা যাবে। ব্যর্থতা তাদের কাছে কোনো শেষ নয়, বরং এক নতুন পাঠ।

. জ্ঞানের কদর এবং কোচের প্রয়োজনীয়তা
মধ্যবিত্তের কাছে কোনো বিষয়ের বিশেষজ্ঞ বা কোচ ভাড়া করা মানেই বিলাসিতা। অথচ ধনীরা মনে করেন, এটাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। তারা জানেন, একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ তাদের ভুল হওয়া থেকে বাঁচাবে এবং হাজার ঘণ্টা সময় সাশ্রয় করবে। সময় বাঁচানো মানেই তো টাকা বাঁচানো।

. সময় যখন পরম সম্পদ
টাকার চেয়ে সময়ের মূল্য ধনীদের কাছে অনেক বেশি। মকবুল সাহেব হয়তো দুই টাকা বাঁচানোর জন্য আধা ঘণ্টা হেঁটে পাশের বাজারে যান, কিন্তু ধনীরা টাকা দিয়ে সময় কেনেন। তারা বাড়ির কাজের জন্য লোক রাখেন, এমনকি প্রয়োজনে প্রাইভেট ফ্লাইটে চড়েন- স্রেফ সময় বাঁচাতে। কারণ তারা জানেন, টাকা হারিয়ে গেলে আবার পাওয়া যাবে, কিন্তু এক সেকেন্ড সময় চলে গেলে তা আর কোনো দিন ফেরার নামগন্ধও করবে না।

. খাবার টেবিলে টাকার আলাপ
আমাদের সমাজে অনেক পরিবারে শিশুদের সামনে টাকা নিয়ে আলাপ করা প্রায় ‘নিষিদ্ধ’। মনে করা হয়, ছোটদের এসবে না থাকাই ভালো। কিন্তু ধনীরা ঠিক উল্টো। তারা খাবার টেবিলে স্বামী-স্ত্রী মিলে বাজেট ঠিক করেন, সন্তানদের সঙ্গে অর্থ ও সঞ্চয় নিয়ে গল্প করেন। তাদের ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শেখে যে টাকা কোনো জাদুমন্ত্র নয়, এটা একটা বিজ্ঞানের মতো।

. নিজের ওপর বিনিয়োগ
একজন ধনী মানুষ দুই দিনের এক কর্মশালায় লাখ টাকা খরচ করতে পিছপা হন না। মধ্যবিত্তের চোখে এটা স্রেফ পাগলামি মনে হতে পারে, কিন্তু ধনীরা জানেন- একটা নতুন আইডিয়া বা একটা ভালো সম্পর্ক ভবিষ্যতে তাকে কোটি টাকা এনে দিতে পারে। বই পড়া, নতুন কোর্স করা কিংবা সেমিনারে যাওয়া তাদের কাছে এক ধরণের অদৃশ্য সম্পদ।

. সাধারণ পোশাক অসাধারণ মুক্তি
আমরা মনে করি, দামি পোশাক না পরলে মান-সম্মান থাকবে না। অথচ আসল ধনীদের দেখা যায় সাধারণ টি-শার্ট কিংবা পুরোনো মডেলেল গাড়িতে। তারা জানেন, আসল মর্যাদা লৌকিকতায় নয়, আসল মর্যাদা হলো ‘স্বাধীনতা’য়। আমি কোথায় থাকব, কার সঙ্গে সময় কাটাব আর কী কাজ করব- এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই হলো তাদের আসল ঐশ্বর্য।

. প্রজন্মের ভাবনা
মকবুল সাহেব বড়জোর নিজের রিটায়ারমেন্ট বা মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ধনীদের ভাবনা চলে যায় আগামী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত। তারা ট্রাস্ট গঠন করেন, পারিবারিক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করেন। তারা শুধু নিজের জন্য নয়, তাদের নাতি-পুতিদের জন্যও এক মজবুত ভিত্তি দিয়ে যেতে চান।

পরিশেষ
খবরটা পড়ে মকবুল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝলেন, ধনী হওয়াটা আসলে পকেটের অবস্থার চেয়ে মনের অবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করে। আপনি কীভাবে চিন্তা করছেন, সময়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন আর টাকা দিয়ে টাকা বানানোর সাহস দেখাচ্ছেন কি না- তার ওপরই নির্ভর করছে আপনার ভবিষ্যৎ।

ঢাকা শহরের আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি নামবে বোধ হয়। মকবুল সাহেব ভাবলেন, আজ থেকে জমানোর চেয়ে বিনিয়োগ করার কথা ভাবলে কেমন হয়? বিচিত্র এই জগত, আর বিচিত্র মানুষের চিন্তাভাবনা!