মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। তার পায়ের নিচে সব সময় সর্ষে দানা থাকে। মন চায় ডানা মেলে অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমাতে। তবে এই আধুনিক যুগে ডানা থাকলেই হয় না, সাথে একখানা শক্তিশালী পাসপোর্ট আর ভিসার কাগজ লাগে। আমাদের বাংলাদেশি পাসপোর্টখানা এখন ৯৬তম অবস্থানে। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স নামের এক মস্ত বড় জাদুকরী প্রতিষ্ঠান বলছে, আমরা নাকি আগাম ভিসা ছাড়াই ৩৬টি দেশে ঘুরে আসতে পারি। সেই তালিকায় ‘কেপ ভার্দে’ নামে এক রহস্যময় দ্বীপরাষ্ট্রের নামও ঝকঝক করছিল।

কিন্তু ভাই সাহেব, গল্পের ভেতর সবসময় একটা ‘কিন্তু’ থাকে। কেপ ভার্দের সরকারি তথ্য বলছে অন্য কথা।

ভিসার গোলকধাঁধা
আপনি যদি মনে করেন সুটকেস গুছিয়ে কালই কেপ ভার্দের উদ্দেশে রওনা দেবেন, তবে একটু থামুন। দেশটির নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৯১টি দেশের নাগরিকদের জন্য আগাম ভিসা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন আর সেখানে ‘আসুন, বসুন, চা খান’ টাইপ অভ্যর্থনা পাওয়া যাবে না। ভিসা ছাড়া গেলে আপনাকে হয়তো বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকেই করুণ মুখে বিদায় নিতে হবে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে – প্রবেশ, ট্রানজিট বা যাত্রাবিরতি, যা-ই হোক না কেন, ভিসা ছাড়া উপায় নেই।

এখন প্রশ্ন হলো, ভিসা পাবেন কোথায়? বাংলাদেশে এই দেশটির কোনো দূতাবাস নেই। আপনাকে খুঁজতে হবে নিকটস্থ কোনো তৃতীয় দেশ। ব্যাপারটা অনেকটা সেই প্রবাদের মতো – ‘দিল্লি হনুজ দূর অস্ত’!

আসমা আজমেরীর গল্প
ভ্রমণপিপাসু কাজী আসমা আজমেরী নামের এক সাহসী মেয়ের গল্প বলি। তিনি ২০২৪ সালে কেপ ভার্দে যাওয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিলেন। সেনেগালে থাকাকালীন সেখান থেকে তিনি ছয় মাসের একটি ভিসাও জোগাড় করে ফেললেন। কিন্তু বিধাতা হয়তো হাসছিলেন। মালিতে গিয়ে তিনি আটকা পড়লেন জ্বালানি সংকটের মারপ্যাঁচে। ফ্লাইট বাতিল হলো, শেষমেশ তার কেপ ভার্দে যাওয়া আর হলো না। জীবনটা আসলে এমনই – ভিসা থাকলেও অনেক সময় গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।

কেপ ভার্দে: যেখানে নীল আর সবুজের মেলা
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি আগ্নেয় দ্বীপ নিয়ে এই দেশ। মাত্র ছয় লাখ মানুষের বাস। ছোট দেশ হতে পারে, কিন্তু তার মায়া অনেক। নীল সমুদ্রের সৈকত, জেগে থাকা আগ্নেয়গিরি আর তাদের নিজস্ব ‘ক্রেওল’ সংস্কৃতি ও সংগীত – সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ। পর্যটকদের কাছে এই দেশটি দিন দিন মায়াবী আকর্ষণে রূপ নিচ্ছে।

যাবেন কীভাবে?
বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কোনো পাল তোলা নৌকা কিংবা উড়োজাহাজ সেখানে যায় না। আপনাকে যেতে হবে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসে। প্রথমে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা, তারপর সেখান থেকে সেনেগাল হয়ে পৌঁছাতে হবে কেপ ভার্দে। পর্তুগাল হয়েও যাওয়া যায়, যদি কপালে শিকায় ছিঁড়ে।

শেষ কথা
দুনিয়ায় কোনো কিছুই স্থির নয়, মানুষের বানানো ভিসার নিয়ম তো নয়ই। ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ওয়েবসাইটের দিকে একটু নজর রাখা ভালো। হেনলি ইনডেক্স হয়তো আপনাকে স্বপ্ন দেখাবে, কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় পাসপোর্টের পাতায় লুকানো থাকে।

বাইরে হয়তো বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠেছে। এমন সময়ে কেপ ভার্দের নীল জলরাশির কথা ভাবলে মন্দ হয় না। তবে সাবধান, টিকিট কাটার আগে ভিসার খবরটা নিতে ভুলবেন না যেন!

শুভ যাত্রা, আপনার ভ্রমণ মায়াময় হোক।