ঢাকার সকাল মানেই এক অস্থির ছোটাছুটি। জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে রাস্তার দিকে তাকালে দেখা যায়, শত শত রিকশা আর সিএনজির ভিড়ে ছোট ছোট কিছু মুখ জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে আছে। পিঠে তাদের পাহাড়সম ওজনের ব্যাগ। গরমে ঘেমে বাচ্চাগুলোর মুখ লাল হয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে কোনো আনন্দ নেই, আছে একরাশ ক্লান্তি। দৃশ্যটা দেখলে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা হাহাকার তৈরি হয়। আমাদের এই ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহরটা কি শিশুদের জন্য একটুও মায়া জমা করে রাখেনি?

তবে আজ সকালের খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে মনটা হুট করেই ভালো হয়ে গেল। এক কাপ চা হাতে নিয়ে খবরটা কয়েকবার পড়লাম। ঢাকা এবং দেশের বড় শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খবরটা পড়ে মনে হলো, মেঘলা আকাশে এক চিলতে কড়া রোদের দেখা মিলল।

কল্পনা করুন তো দৃশ্যটা—শহরের মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে হলুদ রঙের বড় বড় বাস। বাসের গায়ে হয়তো বড় করে লেখা ‘স্কুল বাস’। বাচ্চারা দল বেঁধে হাসিমুখে বাসে উঠছে। তাদের সেই মস্ত বড় ব্যাগটা আর পিঠে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে না, বাসের সিটের পাশে সুন্দর করে রেখে দিচ্ছে। বাসের ভেতরে হয়তো হালকা কোনো সুর বাজছে, কিংবা বাচ্চারা নিজেরাই মেতে উঠেছে খুনসুটিতে। জানালার পাশে বসে তারা দেখছে বাইরের ব্যস্ত শহরটাকে, কিন্তু সেই ব্যস্ততা তাদের আর ছুঁতে পারছে না। তারা সুরক্ষিত, তারা শান্তিতে আছে।

আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েনে বাবা-মায়েরা সবসময় এক ধরনের অদৃশ্য ভয়ের মধ্যে থাকেন। সন্তান ঠিকমতো স্কুলে পৌঁছাল কি না, রিকশাটা উল্টে গেল কি না, কিংবা হুট করে আসা বৃষ্টিতে ভিজে তার জ্বর আসবে কি না—এসব দুশ্চিন্তা তাদের নিত্যসঙ্গী। এই বিশেষ বাস সার্ভিস চালু হলে সেই বাবার চিন্তিত কপালে কিছুটা হলেও স্বস্তির রেখা দেখা দেবে। মা হয়তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিশ্চিত মনে হাত নাড়বেন, যখন তার সন্তানকে নিয়ে বাসটা মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যাবে।

আমি সবসময়ই বলি, এই পৃথিবীটা শিশুদের জন্য সুন্দর হওয়া উচিত। তাদের শৈশবটা হওয়া উচিত নীল অপরাজিতার মতো স্নিগ্ধ। অথচ আমরা তাদের হাতে তুলে দিয়েছি ট্রাফিক জ্যাম আর ধোঁয়াশাভরা এক শহর। এই বাস চালুর উদ্যোগটি যদি সত্যি সত্যি বাস্তবায়িত হয়, তবে ঢাকা শহরটা হয়তো আর শিশুদের কাছে দানব মনে হবে না।

হয়তো কোনো একদিন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। সেই বৃষ্টির দুপুরে আমাদের সন্তানেরা বাসের জানালার কাঁচ সরিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরার চেষ্টা করবে। তাদের চোখে তখন পড়ার চাপ থাকবে না, থাকবে অজানাকে জানার আনন্দ। এই ছোট্ট উদ্যোগটি যদি আমাদের সন্তানদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাতে পারে, তবেই এই যান্ত্রিক শহরটা সার্থক।

আমরা বড়রা অনেক ভুল করি, অনেক ব্যর্থতা আমাদের। কিন্তু অন্তত আমাদের সন্তানদের জন্য যাতায়াতের এই পথটুকু যদি নিরাপদ ও আনন্দময় করে দিয়ে যেতে পারি, তবে মহাকালের কাছে আমরা হয়তো কিছুটা হলেও ক্ষমা পাব। বাসের জানালার পাশে বসা সেই শিশুটির হাসিমুখের চেয়ে সুন্দর দৃশ্য এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। শহরটা আবার শিশুদের হোক, এটাই আমাদের প্রার্থনা।