ঢাকা শহরটা বড় অদ্ভুত। এখানে রাস্তার জ্যামে বসে মানুষ বুড়ো হয়ে যায়, আবার সেই মানুষই এখন মাটির ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে ট্রেনে চড়ে অফিস যায়। তবে শুধু যাতায়াত নয়, সরকার বাহাদুর এখন মেট্রো স্টেশনগুলোকে বানিয়ে ফেলেছেন আধুনিক এক একটা ‘গঞ্জ’। উত্তরা থেকে আগারগাঁও—প্রতিটি স্টেশনেই এখন পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানপাট। টিকিট না কেটেও স্রেফ শপিং করতে এখন আপনি স্টেশনে যেতে পারেন। বিচিত্র এই কারবার!

উত্তরা উত্তর (দিয়াবাড়ি)

দিয়াবাড়ি স্টেশনে নামলেই দেখবেন ‘ফ্রেশ সুপার মার্ট’ আর ‘ঘরের বাজার’। ফ্রেশ-এ পাওয়া যাচ্ছে ঘরের টুকিটাকি সব গ্রোসারি। আর ঘরের বাজার দিচ্ছে একেবারে ‘অর্গানিক’ সব বস্তু। শাহি লাচ্ছা সেমাই থেকে শুরু করে কালো রসুন (ব্ল্যাক গার্লিক), এমনকি অশ্বগন্ধা পাউডার পর্যন্ত আছে। যারা মধু ভালোবাসেন, তাদের জন্য আছে সুন্দরবনের মধু কিংবা কাঠের ফ্রেমে বন্দী চাকের মধু। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সেখানে চকলেট আকৃতির ছোট ছোট মধুর প্যাকেট পাওয়া যায়। ছাত্রছাত্রীরা আইডি কার্ড দেখালে ৫ শতাংশ ছাড় পায়। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের কোনো এক টগবগে তরুণ ছাত্র হয়তো এখান থেকে মধু কিনে তার প্রিয়তমাকে উপহার দিয়ে বলবে— “এই নাও, খাঁটি মধু। প্রেমের চেয়েও খাঁটি।”

উত্তরা সেন্টার ও দক্ষিণ

উত্তরা সেন্টারেও ‘ফ্রেশ’-এর আউটলেট আছে। সেখানে কফি খেতে খেতে কিছুক্ষণ উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়। তবে উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনটি এখন কিছুটা নির্জন, সেখানে কোনো দোকানপাট বসেনি। স্টেশনের সেই অংশটি যেন কোনো এক বিষণ্ণ বিকেলের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

পল্লবী

পল্লবী স্টেশনে গেলে আপনার মনে হবে আপনি কোনো এক বিলাসী সুপারশপে ঢুকে পড়েছেন। এখানে আছে ‘এক্সপ্রেস বাই ইউনিমার্ট’। মাছ-মাংস ছাড়া সংসারের প্রায় সবকিছুই সেখানে মিলবে। আর কফি প্রেমীদের জন্য আছে ‘ইন্ডালজ’। কফির দাম অবশ্য সাধারণের নাগালের কিছুটা ওপরে। ১৯৫ টাকার এসপ্রেসো থেকে শুরু করে ৩৯৫ টাকার আইস ব্লেন্ডেড কফি। দাম শুনে আমাদের হিমু হয়তো পকেট হাতড়ে দেখত কটা নীল পদ্ম কেনা যেত এই টাকায়। তবে স্বাদে কোনো কমতি নেই—হ্যাজেলনাট থেকে বাটারস্কচ, সবই আছে সেখানে।

মিরপুর ১১ ও ১০

মিরপুর ১১ নম্বরেও ফ্রেশ-এর আধিপত্য। আর মিরপুর ১০ নম্বর হলো বিপদে আপদে ভরসা। সেখানে ফ্রেশ-এর সবচেয়ে বড় দোকান, এমনকি প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও পাওয়া যায়। ট্রেনের যাত্রী না হয়েও এলাকার লোকজন এখন লিফট দিয়ে স্টেশনে উঠে দিব্যি কেনাকাটা করছে।

কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া

কাজীপাড়া স্টেশনটি ভোজনরসিকদের জন্য স্বর্গ। এখানে ইউনিমার্ট আর ইন্ডালজ তো আছেই, সাথে যুক্ত হয়েছে ‘টেস্টি ট্রিট’ আর ‘কুপার্স’। কুপার্সে বসে আয়েশ করে চিকেন স্যান্ডউইচ কিংবা বারবিকিউ র‍্যাপ খাওয়া যায়। ১৫০ টাকার আমেরিকানো কফি হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসলে মনে হবে—জীবনটা মন্দ না। জন্মদিন পালনের জন্য ১ হাজার ৪৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকার কেকও সেখানে সাজানো আছে। শেওড়াপাড়াতেও ‘ঘরের বাজার’ আর ‘টেস্টি ট্রিট’ ওত পেতে আছে আপনার ক্ষুধা মেটানোর জন্য।

আগারগাঁও

যাত্রার শেষ প্রান্তে আগারগাঁও স্টেশনটি অবশ্য এখন নীরব। সেখানে কোনো বাণিজ্যিক দোকান নেই। হয়তো ভ্রমণ শেষে একটু নিস্তব্ধতার জন্যই এই ব্যবস্থা।

কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য (যা জেনে রাখা ভালো):

মেট্রোরেলের এসব দোকান সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, টিকিট কাটার জায়গায় (কনকোর্স লেভেল) ঢোকার আগেই এসব দোকান। অর্থাৎ, ট্রেন ভ্রমণ না করেও আপনি সেখানে গিয়ে ঘুরে দেখতে পারেন, কেনাকাটা করতে পারেন। তবে এক প্রান্তের দোকানে গিয়ে অন্য প্রান্তে যেতে হলে আপনাকে নিচে নেমে আবার অন্য সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হবে—টিকিট কাউন্টার পেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই।

ঢাকা শহরটা বদলাচ্ছে। স্টেশনে এখন শুধু ট্রেনের হুইসেল শোনা যায় না, শোনা যায় কফি মেশিনের শব্দ আর অর্গানিক মধুর ঘ্রাণ। বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে ট্রেনের ওপর থেকে ঢাকাকে দেখতে দেখতে এক কাপ কফি—মন্দ কী! জীবন তো শেষ পর্যন্ত ছোট ছোট কিছু আনন্দের সমষ্টি।