ঢাকা শহরের সময় এখন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। সময় যে স্থির নয়, এটা আইনস্টাইন অনেক আগেই বলে গেছেন। কিন্তু তিনি যদি আমাদের মগবাজার কিংবা কারওয়ান বাজারের জ্যামে বসে থাকতেন, তবে তাঁর আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব তিনি নতুন করে লিখতেন।
খবরের কাগজে বেরিয়েছে, ২০০৭ সালে ঢাকা শহরের গড় গতি ছিল ২১ কিলোমিটার। ২০২২ সালে এসে সেটা দাঁড়িয়েছে ৪.৮ কিলোমিটারে। অর্থাৎ একজন সুস্থ মানুষ যদি স্বাভাবিক গতিতে হাঁটে, সে গাড়ির আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে। ঢাকা এখন পৃথিবীর একমাত্র শহর যেখানে মানুষ আর কচ্ছপের দৌড়ে কচ্ছপই জয়ী হবে, আর মানুষটি গাড়িতে বসে এসি ছেড়ে ঘুমাবে।
সরকার বাহাদুর অবশ্য এই স্থবিরতা নিয়ে চিন্তিত। তাঁরা ঠিক করেছেন, এখন থেকে জ্যামে পড়লে বা জ্যামপূর্ণ রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালালে পয়সা দিতে হবে। নাম দেওয়া হয়েছে- ‘যানজট শুল্ক’। কিলোমিটার প্রতি ৬ টাকা ২৭ পয়সা। খুব অদ্ভুত একটা হিসাব। কেন ৬ টাকা ২৫ পয়সা হলো না, বা কেন সাড়ে ৬ টাকা হলো না- সেই রহস্য হয়তো কোনো একদিন হিমু উদঘাটন করবে।
মোবারক হোসেন সাহেব সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজটা দেখছিলেন। তাঁর মেজাজ এমনিতেই খারাপ, আজ বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে অথচ ছাতাটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি তাঁর স্ত্রী রেবেকাকে ডেকে বললেন, “দেখেছো রেবেকা, এখন থেকে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া আর কোনো শৌখিন রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া সমান কথা। ৬ টাকা ২৭ পয়সা পার কিলোমিটার! আমি যদি মতিঝিল থেকে উত্তরা যাই, তবে জ্যামে পড়ার পুরস্কার হিসেবে সরকারকে শুল্ক দিতে হবে।”
রেবেকা নির্বিকার মুখে বললেন, “ভালোই তো। তুমি তো এমনিতেও জ্যামে বসে বসে এফএম রেডিও শোনো আর ঘুমিয়ে নাক ডাকো। এখন থেকে ভাড়া দিয়ে ঘুমাবে। সরকারি স্লিপিং কোচ।”
এই শুল্ক অবশ্য সব রাস্তায় নয়। মেট্রোরেল বা বিআরটি আছে এমন উন্নত রুটে প্রাইভেট কার, মোটরবাইক আর ট্রাকের ওপর এই খড়গ নামবে। প্রযুক্তিরও নাকি দারুণ ব্যবহার হবে। আরএফআইডি (RFID) রিডার দিয়ে অটোমেটিকভাবে পকেট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হবে। আপনার পকেটে টাকা নেই, কিন্তু রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন- এমনটা আর হবে না।
বিশ্বব্যাংক বলছে, এই জ্যামের কারণে প্রতিদিন ঢাকা শহরে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। ৯৮ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কয়টা আস্ত দ্বীপ কেনা যায়, মোবারক হোসেন সাহেব সেই হিসাব মেলাতে পারলেন না। তবে তিনি এটা বুঝলেন, জ্যাম কমানোর এই বুদ্ধিটা বেশ মডার্ন।
বুয়েটের বড় একজন প্রফেসর সামছুল হক সাহেব অবশ্য একটা দারুণ কথা বলেছেন। একে তিনি বলছেন ‘ভেরিয়েবল মাশুল’। মানে হলো- ভোর চারটায় যখন রাস্তা খাঁ খাঁ করবে, তখন কোনো ট্যাক্স নেই। কিন্তু বেলা বারোটায় যখন সবাই যুদ্ধক্ষেত্রে নামবে, তখন মাশুলের হার হবে চড়া। অনেকটা নিলামে ওঠার মতো। যে যত টাকা দেবে, সে তত শান্তিতে জ্যামে বসে থাকবে।
সরকার ভাবছে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত একটা মহা-পরিকল্পনা। এই শুল্কের টাকা দিয়ে তাঁরা নাকি আরও রাস্তা বানাবে, মেট্রোরেল বানাবে।
মোবারক হোসেন সাহেব চশমাটা মুছে আবার খবরের কাগজটা ভাঁজ করলেন। তাঁর কেন যেন মনে হচ্ছে, টাকাটা দেওয়ার পর জ্যাম কমবে কি না তা বড় কথা নয়, জ্যামে বসে থাকার যে বিলাসিতা, তার জন্য সরকার এখন একটা অফিশিয়াল ‘এন্ট্রি ফি’ ধার্য করে দিল।
ঢাকা শহর বড় বিচিত্র জায়গা। এখানে মানুষ ৪.৮ কিলোমিটার বেগে চলে, আর ৬ টাকা ২৭ পয়সা গুনে মনে মনে ভাবে- আমি আধুনিক এক স্মার্ট সিটিতে বাস করছি!
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে। মোবারক হোসেন সাহেবের ছাতাটা এখনো পাওয়া যায়নি। আজ হয়তো তাঁর আর অফিসে যাওয়া হবে না। তবে একটা সান্ত্বনা আছে, আজ তাঁর পকেট থেকে অন্তত কিলোমিটার প্রতি ৬ টাকা ২৭ পয়সা বেঁচে গেল। তিনি রেবেকাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এক কাপ চা দাও তো রেবেকা। বাইরে বৃষ্টি, আর আমি বাড়িতে বসে টাকা সেভ করছি- এর চেয়ে আনন্দ আর কী হতে পারে!”


