আমাদের এই দেহটা বড়ই বিচিত্র এক কলকব্জার কারখানা। আমরা ভাবি লিভার তার নিজের মতো কাজ করছে, আর অগ্ন্যাশয় তার নিজের মতো। অথচ শরীরের ভেতর এরা একে অপরের কানে কানে সারাক্ষণ গোপন কথা বলে। ইদানীং আমাদের দেশে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ফ্যাটি লিভার বা কলিজায় চর্বি জমার উপদ্রব খুব বেড়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর গালভরা নাম – ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’ বা এমএএসএলডি। নামটা শুনে ভিরমি খাওয়ার কিছু নেই, এর আসল রহস্যটা কিন্তু খুব সরল।
ইনসুলিন যখন অবাধ্য হয়
ডায়াবেটিস আর ফ্যাটি লিভার – দেখতে আলাদা মনে হলেও এদের জন্ম আসলে একই উৎস থেকে। এর নাম ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’। ধরুন, ইনসুলিন হলো একটা চাবি, যা রক্ত থেকে গ্লুকোজকে ঘরের (কোষের) ভেতর ঢোকাবে। কিন্তু কোনো কারণে চাবিটা যখন তালা খুলতে পারে না, তখন রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায় – যাকে আমরা বলি ডায়াবেটিস। আর ঠিক একই সময়ে ওই অবাধ্য ইনসুলিনের কারণে লিভারেও চর্বি জমতে শুরু করে।
ভাই সাহেব, মজার ব্যাপার হলো – যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ জনেরই লিভারে চর্বি জমে থাকে। এরা অনেকটা যমজ ভাইয়ের মতো, একজন এলে অন্যজনও পেছন পেছন চলে আসে। বিশেষ করে আমাদের মতো যাদের ভুঁড়িটা একটু বেড়েছে, তাদের বেলায় এরা খুব বেশি ভাব জমায়।
নীরব ঘাতকের আনাগোনা
ফ্যাটি লিভারের বড় সমস্যা হলো, সে কোনো আওয়াজ করে আসে না। সে হলো এক নীরব আগন্তুক। শরীর খুব একটা খারাপ লাগে না, মাঝে মাঝে একটু ক্লান্তি বা পেটের ডান দিকে একটু ভার ভার ঠেকতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে লিভারের বারোটা বাজিয়ে দেয়। প্রদাহ বাড়তে থাকে, আর অবহেলা করলে তা লিভার সিরোসিস বা ক্যানসারের মতো ভয়ঙ্কর দিকে মোড় নিতে পারে। ডায়াবেটিস এমনিতে হার্ট বা কিডনির ক্ষতি করে, তার ওপর ফ্যাটি লিভার সঙ্গী হলে বিপদটা ডাবল হয়ে যায়।
আয়নায় লিভার দেখা
এখন প্রশ্ন হলো, বুঝবেন কীভাবে? লিভার তো আর আয়নায় দেখা যায় না। এর জন্য আলট্রাসনোগ্রাফি আর রক্তের কয়েকটা পরীক্ষা (এএলটি বা এএসটি) করলেই আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। আমার পরামর্শ হলো, যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা বছরে অন্তত একবার লিভারটা পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। সাবধানের মার নেই!
মুক্তির উপায়: একটু হাঁটাচলা আর সবুজ পাতা
ডায়াবেটিস আর ফ্যাটি লিভার – দুটোই কিন্তু আপনার জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি আপনার বর্তমান ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারেন, তবে এই দুই আপদই লেজ গুটিয়ে পালাবে।
সহজ কিছু নিয়ম মেনে দেখুন না –
১. প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ঘাম ঝরিয়ে হাঁটুন। খোলা আকাশের নিচে হাঁটলে মনের সাথে শরীরটাও সজীব হয়।
২. মিষ্টি আর তেল-চর্বিওয়ালা ভাজাপোড়া খাবারগুলোকে একটু দূরে সরিয়ে রাখুন।
৩. পাতে বেশি করে সবুজ শাকসবজি আর ফলমূল রাখুন।
জীবনটা আসলে খুব ছোট। এই ছোট জীবনে অবহেলা করে শরীরটাকে নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, নিয়ম মেনে চলুন। দেখবেন, আপনার অবাধ্য ইনসুলিন আবার বাধ্য হয়ে গেছে আর লিভারের চর্বিও কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।
বাইরে হয়তো আকাশটা মেঘলা, কিংবা কোথাও এক চিলতে রোদ। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।
সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!


