ঢাকা শহরটাকে আমার মাঝে মাঝে একটা বিশাল রাক্ষসের মতো মনে হয়। রাক্ষসটার খিদে খুব বেশি, কিন্তু তার থাকার জায়গা খুব কম। এই রাক্ষসটাকে শান্ত করার জন্য সরকার বাহাদুর এবার নতুন এক জাদুকরী নিয়ম জারি করেছেন। খটমটে ভাষায় এর নাম ‘সংশোধিত ড্যাপ’ ও ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০২৫’।
সহজ করে বললে, এখন থেকে এই ঘিঞ্জি শহরে আপনার দালানগুলো হবে আরও খানিকটা চওড়া, আর ফ্ল্যাটের সংখ্যা হবে আরও বেশি। যারা ভাবছিলেন মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পাবেন কি না, তাদের জন্য খবরটি আনন্দের হতে পারে, আবার পকেটের জন্য কিছুটা বিষাদেরও।

ফার (FAR) এবং এক চিলতে বেশি বারান্দা
আমাদের দেশের আবাসন ব্যবসায়ীরা অনেকদিন ধরেই কান্নাকাটি করছিলেন। তাদের দাবি ছিল – জমি তো বাড়ছে না, তাহলে বিল্ডিং কেন বড় হবে না? সরকার তাদের কথা শুনেছে। আগে ২০ ফুট রাস্তার পাশে ৫ কাঠা জমিতে আপনি যতটা বড় বাড়ি বানাতে পারতেন, এখন পারবেন তার চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। মোহাম্মদপুরে যেখানে ৮ হাজার বর্গফুটের বিল্ডিং হতো, সেখানে এখন হবে ১১ হাজার ৭০০ বর্গফুট। এই যে বাড়তি জায়গা, এটা অনেকটা ছোটবেলায় মেলায় কেনা সেই ম্যাজিক বলের মতো, যা জলে ভেজালে টুপ করে বড় হয়ে যায়।
পুরান ঢাকার ম্যাজিক
সবচেয়ে বড় জাদুকরী কাণ্ড ঘটেছে পুরান ঢাকায়। সেখানে ৫ কাঠা জমিতে আগে ফ্ল্যাট হতো মাত্র ৬টি। এখন থেকে সেখানে ১২টি ফ্ল্যাট করা যাবে! ভাবুন একবার, একই জায়গায় আগের চেয়ে দ্বিগুণ মানুষের বসবাস। গাদাগাদি করে থাকার এক মহোৎসব শুরু হতে যাচ্ছে। তবে গুলশান-বনানী বা ধানমন্ডিতে নিয়মটা আবার একটু অন্যরকম, সেখানে কোথাও বেড়েছে, কোথাও বা কমেছে। ঢাকার একেক এলাকার ভাগ্য একেক রকম।
সবুজ ঘাসের জন্য মন খারাপ
তবে এই ড্যাপের একটা ভালো দিকও আছে। সরকার বলেছে, কৃষিজমিতে আর কোনো পাকা দালান তোলা যাবে না। সেখানে আপনি চাইলে মুরগির খামার করতে পারেন, মাছের চাষ করতে পারেন, কিন্তু মুদি দোকান বা স্কুল ঘর করতে পারবেন না। শহরটা যখন কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে যাচ্ছে, তখন এক চিলতে কৃষিজমি বাঁচানোর এই চেষ্টা দেখে ভালো লাগে। প্রকৃতির প্রতি এই সামান্য মায়া কি আমাদের ভেতরে এখনো টিকে আছে?
পকেটে টান এবং কিছু দীর্ঘশ্বাস
কিন্তু ভাই সাহেব, কোনো আনন্দই তো আর নিখরচায় আসে না। বাড়ি বানানোর নকশা জমা দেওয়ার ফি আগে ছিল এক হাজার টাকা, এখন সেটা এক লাফে হয়েছে পাঁচ হাজার। আর ইমারত নির্মাণ অনুমোদনের ফি-ও বেড়েছে আকাশছোঁয়া। আগে যেখানে ২৬ হাজার টাকা দিলেই হতো, এখন সেখানে গুনতে হবে দেড় লাখ টাকা!
অর্থাৎ, আপনার ফ্ল্যাট বড় হবে ঠিকই, কিন্তু সেই ফ্ল্যাট কেনার বা বানানোর খরচটাও হবে রাক্ষুসে। মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাসটা তাই আগের মতোই থেকে যাচ্ছে।
শেষ কথা
ঢাকা শহরটা আরও উঁচু হবে। আকাশটা হয়তো আর আগের মতো দেখা যাবে না। চিলেরা বাসা বাঁধার জায়গা পাবে না, আর আমরা আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে ভাবব – ইস, যদি এক টুকরো মেঘ ছোঁয়া যেত!
ব্যবসায়ীরা খুশি, সরকারও খুশি। আর আমরা? আমরা ওই দ্বিগুণ হওয়া ফ্ল্যাটের কোনো একটায় বসে জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকব ধোঁয়াটে আকাশের দিকে। জীবনটা বড়ই বিচিত্র, বড়ই অনিশ্চিত।
বাইরে হয়তো এখন বৃষ্টি পড়ছে। এই বৃষ্টির দিনে ড্যাপের কথা ভুলে গিয়ে এক কাপ চা নিয়ে বসলে কেমন হয়? নিয়মের বেড়াজাল তো চলতেই থাকবে, চা-টা অন্তত শান্তিতে খাওয়া যাক।


