মানুষের জীবনটা খুব বিচিত্র। আমরা পুরোনোকে ভুলে যেতে চাই, আবার এক সময় হাহাকার করে সেই পুরোনোকেই নতুন মোড়কে ফিরে পেতে চাই। আসবাবপত্রের বেলাতেও তাই হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাঙালির ড্রয়িং রুমে বেতের একটা রাজত্ব ছিল। বসার ঘরে নকশা করা বেতের সোফা, কোণে একটা বইয়ের তাক, আর বারান্দায় একটা আরামদায়ক ইজি চেয়ার। বিকেলবেলা বাবা সেখানে বসে খবরের কাগজ পড়তেন, আর মা হয়তো পাশের মোড়ায় বসে মন দিয়ে উল বুনতেন।

মাঝখানে বেতের সেই জৌলুস একটু ম্লান হয়ে গিয়েছিল। মানুষ প্লাস্টিক আর ভারি কাঠের চকচকে আসবাবের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। কিন্তু মায়া কি আর সহজে ফুরিয়ে যায়? আধুনিক এই যান্ত্রিক সময়ে মানুষ আবার প্রকৃতির কাছে ফিরতে চাইছে। তাই তো গৃহসজ্জায় আবারও ফিরে এসেছে সেই নান্দনিক বেত।

প্রাচীন এক রূপকথা
এই যে আমরা অবলীলায় বেতের মোড়ায় বসে চা খাই, এর ইতিহাস কিন্তু আজকের নয় – একেবারে রূপকথার মতো পুরোনো। শোনা যায়, আদি চীনে ঝুড়ি বুনন থেকে এই শিল্পের শুরু। খ্রিষ্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে মিশরের মমির দেশেও নাকি বেতের চেয়ারের অস্তিত্ব ছিল। এমনকি উনবিংশ শতাব্দীতে ডাচ আর ইংরেজদের আভিজাত্যের প্রতীকও ছিল এই বেত। ইউরোপের নামিদামি ক্যাফেগুলোতে মানুষ বেতের চেয়ারে বসেই দীর্ঘ আড্ডা জমাত।

হারানো গৌরবের প্রত্যাবর্তন
বেতের আসবাবের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর সারল্য। এটি ওজনে হালকা, কিন্তু এর ভেতরে একটা ধ্রুপদী আভিজাত্য লুকিয়ে আছে। বর্তমানের আধুনিক ফ্ল্যাটগুলোতে যখন তপ্ত রোদের পর বিকেলে জানালার পাশে একটা বেতের দোলনা দুলতে থাকে, তখন মনে হয় যান্ত্রিকতার ভিড়ে এক চিলতে শান্তির ছোঁয়া। শৌখিন মানুষেরা এখন আর কেবল শোপিস নয়, খাট থেকে শুরু করে ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত সব জায়গাতেই বেতকে খুঁজে নিচ্ছেন। এর প্রাকৃতিক রং আর সূক্ষ্ম বুনন চোখের আরাম দেয়, মনেরও।

বেতের রাজ্য: রাতারগুল থেকে বেতপট্টি
বেতশিল্পের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে সিলেটের রাতারগুল জলাবনের কথা মনে পড়ে। ওটাকে বলা যায় বেতের আদি আধার। সেই বনের কোল ঘেঁষেই সিলেটে গড়ে উঠেছে বেতের এক বিশাল বাজার। সিলেটের ঘাসিটুলা এলাকায় গেলে এখনো সেই ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের দেখা মিলবে, যারা নিপুণ হাতে বেত বুনছেন। আবার রাজশাহীতে ‘বেতপট্টি’ নামে একটা জায়গাই আছে। নামটা শুনলেই কেমন যেন একটা মায়া কাজ করে। মনে হয়, ওই গলি দিয়ে হাঁটলে পুরনো দিনের সেই পরিচিত ঘ্রাণ পাওয়া যাবে।

শেষ কথা
আসবাবের জগতে কত নতুন নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগছে, কিন্তু বেতের সেই পুরোনো আবেদনটি এখনো অমলিন। এটি যেন এমন এক শিল্প যা সময়ের সাথে সাথে পুরনো হয় না, বরং আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে। আজ যারা ঘর সাজাতে আবার বেতকে বেছে নিচ্ছেন, তারা আসলে এক টুকরো ঐতিহ্যকেই নিজের অন্দরে জায়গা দিচ্ছেন।

বাইরে হয়তো এখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এমন সময়ে আপনার ঘরের সেই পরিচিত বেতের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে বসলে মন্দ হয় না। জীবনটাকে তখন খুব একটা জটিল মনে হবে না। শৈশব আর আধুনিকতা – দুটোই যেন ওই বেতের বুননে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।

আপনার যাত্রা শুভ হোক, আপনার ঘর মায়ায় ভরে উঠুক। শুভ গৃহসজ্জা!