আজ শুক্রবার। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। মেঘবালিকা আজ বোধহয় খুব মন খারাপ করে বসে আছে, তার চোখের জলে ঢাকা শহর প্রায় ডুবুডুবু। এমন দিনে কবি-সাহিত্যিকদের জানালার পাশে বসে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিয়ে বৃষ্টি দেখার কথা। কিন্তু সংসারী মানুষের সেই উপায় নেই। তাদের হাতে বাজারের থলি। কাদা ঠেলে তাদের যেতেই হয় কাঁচাবাজারে।

বাজারে গিয়ে দেখা গেল এক বিচিত্র দৃশ্য। আকাশ থেকে ঝরছে বৃষ্টির জল, আর বিক্রেতাদের মুখ দিয়ে ঝরছে চড়া দামের তপ্ত বাণী। বৃষ্টির দোহাই দিয়ে সবজির দাম এক লাফে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্যবিত্তের প্রিয় সবজি ‘পেঁপে’র ভাব এখন আকাশচুম্বী, প্রতি কেজি ৫০ টাকা। কাঁচকলা এক হালি কিনতে গেলেই পকেট থেকে ২০ টাকা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। আলুর মতো অতি সাধারণ জিনিসের কেজি এখন ২৫ টাকা। বাজারে পটল তুলতে গিয়ে খোদ ক্রেতারই ‘পটল তোলার’ দশা- দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা।

বেগুন মশায়ের দেমাগ তো আরো বেশি। মানভেদে তিনি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছেন। করলা, ঝিঙা কিংবা বরবটি- কারো চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে না তারা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে থাকতে চায়। বরবটি ৮০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, এমনকি কচুর লতি পর্যন্ত ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের ঝাল মুখে লাগার আগেই পকেটে লাগছে, দাম ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। তবে এই দুর্যোগে এক চিলতে স্বস্তি কেবল শাকের বাজারে। লাল শাক ১০ টাকা আর পুঁইশাকের আঁটি ১৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বৃষ্টির দিনে পুঁই-চিংড়ি খাওয়ার স্বপ্নটা অন্তত বেঁচে রইল।

চালের বাজারে গিয়ে মেজাজ আর ঠিক রাখা দায়। মিনিকেট চাল এখন ৭৫ টাকা। নাজিরশাইল ৯০ টাকা। আর পোলাওয়ের চাল অর্থাৎ চিনিগুঁড়া চালের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। দাম শুনে মনে হতে পারে, এই চালে বোধ হয় আসলেই চিনি আর সোনা মেশানো আছে।

মাংসের বাজারের অবস্থা তো আরো করুণ। ব্রয়লার মুরগি তার পালক ফুলিয়ে ১৯০ টাকা কেজি দরে বসে আছে। সোনালি মুরগি ৩৬০ টাকা। যারা একটু শৌখিন, দেশি মুরগি খুঁজছেন, তাদের ৬৫০ টাকা গুণতে হচ্ছে। খাসির মাংসের দাম শুনে মনে হলো, খাসিটি জীবদ্দশায় বোধ হয় বিলেত ফেরত ছিল – ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি! গরুর মাংসও কম যায় না, ৮৫০ টাকা পর্যন্ত হাঁকানো হচ্ছে।

সব হাহাকারের মাঝে কেবল মাছের বাজারটাই একটু শান্ত। রুই মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তেলাপিয়া কিংবা পাঙাশের দাম এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। পাঙাশ মাছের দিকে তাকালে মনে হয়, এই বাজারে সে-ই কেবল গরিবের প্রকৃত বন্ধু।

বৃষ্টির দিনে মানুষ খিচুড়ি খেতে ভালোবাসে। কিন্তু বাজারের এই অগ্নিমূল্যে সেই খিচুড়ির চাল, ডাল আর সবজি জোগাড় করতেই মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠছে। দিনশেষে থলি হাতে ভেজা শরীরে যখন মানুষটি ঘরে ফিরছে, তখন তার মনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার বদলে বাজারের হিসাবটাই বারবার ঘুরছে। বৃষ্টি বিলাস কেবল বিত্তবানদের জন্য, মধ্যবিত্তের জন্য কেবলই ‘বৃষ্টি যন্ত্রণা’।

ঢাকা শহরের আকাশ আজও মেঘলা। হয়তো আরও বৃষ্টি হবে। সবজির দাম কি কাল আরও এক কাঠি বাড়বে? প্রকৃতি নীরব, বিক্রেতারাও রহস্যময় হাসছে। মাঝখানে কেবল থলি হাতে ক্রেতা সাধারণ ভিজে একসার হচ্ছেন। অদ্ভুত এই শহর, অদ্ভুত তার বাজার ব্যবস্থা!