মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। সে অন্যের মৃত্যু দেখে কাঁদে, খবরের কাগজে শোকসংবাদ পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আবার পরক্ষণেই সব ভুলে গিয়ে সেই একই বিপজ্জনক খানাখন্দের পাশ দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে যায়। আমাদের স্মৃতি বড়ই স্বল্পস্থায়ী। সেই যে শিশুটি মায়ের কোল থেকে হুট করে এক অন্ধকার গর্তে হারিয়ে গেল, কিংবা সেই মা – যিনি জমে থাকা বৃষ্টির পানির নিচে খোলা ম্যানহোলটি দেখতে পাননি – তাদের কথা আমরা কজন মনে রেখেছি? যারা প্রিয়জনকে হারিয়েছে, কেবল তারাই বুকের ভেতর কষ্টের এক প্রচণ্ড ভারী পাথর বয়ে বেড়ায়। বাকিরা আমরা ‘সাবধানে থেকো’ বলে আবার বেখেয়াল হয়ে পড়ি।
চেনা গর্ত এবং এক অজানা মৃত্যুপুরী
ধরুন, আপনার প্রতিদিনের চলার পথে একখানা ছোট গর্ত আছে। দেখতে দেখতে আপনি গর্তটাকে নিজের ঘরের আসবাবপত্রের মতো চিনে গেছেন। আপনি জানেন ঠিক কোথায় পা ফেললে বিপদ হবে না। কিন্তু একদিন হয়তো খুব তাড়াহুড়ো, কিংবা মনটা খুব খারাপ – হুট করে ওই চেনা গর্তেই আপনি পা পিছলে পড়ে গেলেন।
গর্ত দেখতে সাধারণ হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে বিষাক্ত গ্যাস কিংবা অক্সিজেনের অভাব। ওটা আসলে এক জাদুকরী মৃত্যুপুরী। সেখান থেকে কেউ কেউ হয়তো ফিরে আসে, কিন্তু অনেকের হাড়গোড় কিংবা মস্তিষ্ক এমনভাবে চোট পায় যে বাকি জীবনটা হয়ে ওঠে এক বিষাদময় বোঝা।
রাস্তার যত মায়াবী ফাঁদ
রাস্তা মানেই যে শুধু গর্তের ভয়, তা কিন্তু নয়। রোদ ঝলমলে দিনে হঠাৎ দেখলেন রাস্তায় পানি জমে আছে। আপনি ভাবলেন পা ডুবিয়ে হাঁটাটা বেশ আনন্দের। অথচ আপনি জানেন না, সেই পানির নিচে হয়তো কোনো একটা বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে আছে। এক নিমিষেই আপনার জীবনপ্রদীপ নিভে যেতে পারে।
আবার অনেক সময় আমরা যখন আকাশের মেঘ দেখি, তখন ভুলে যাই মাথার ওপর নির্মাণাধীন ভবন থেকে একটা ইটের টুকরো পড়তে পারে। কিংবা পেছনের দিক থেকে বেপরোয়া গতির কোনো যমদূত (যাকে আমরা মোটর সাইকেল বা বাস বলি) আপনাকে ধাক্কা দিতে পারে।
বেখেয়াল হওয়ার এক অদ্ভুত অসুখ
আমরা এখন আর চলার সময় চারপাশটা দেখি না। কানে হেডফোন গুঁজে আমরা কোনো এক সুরের নেশায় মগ্ন থাকি। কিংবা ফোনের ওপাশে থাকা কোনো এক ছায়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হয়ে যাই। আমরা যখন রাস্তা পার হই, তখন আমাদের চোখ থাকে ফোনের পর্দায়, ট্রাফিক আইনের দিকে নয়।
ভাই সাহেব, জীবনটা তো আর সিনেমার রিল নয় যে পরিচালক বললে আবার নতুন করে শুটিং শুরু হবে। জীবন একবারই পাওয়া যায়।
শেষ কথা
জীবনটা আসলে খুব ছোট। এই ছোট জীবনে তাড়াহুড়া করে আমরা কোথায় যাব? গন্তব্য তো সবারই এক। তাই একটু সময় নিয়ে রওনা দিন। রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোনের ওপাশের মানুষটাকে বলুন, “আমি রাস্তা পার হচ্ছি, পরে কথা বলছি।” সাথে যদি কোনো শিশু থাকে, গর্ভবতী নারী কিংবা কোনো বয়োবৃদ্ধ মানুষ থাকে—তবে তাদের হাতটা শক্ত করে ধরুন। এই মায়ার বন্ধনটুকুই তো আমাদের বড় সম্পদ।
নিজের এলাকায় যদি দেখেন কোনো ম্যানহোল খোলা পড়ে আছে কিংবা কোনো বিদ্যুতের তার বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে, তবে সেটাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেবেন না। দশজন মিলে সমাধান করুন, প্রয়োজনে প্রশাসনের সাহায্য নিন।
বাইরে হয়তো এখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন না।
সাবধানে হাঁটুন। আপনার অপেক্ষায় বাড়িতে কেউ একজন জানালার পাশে বসে আছে। তার কাছে সুস্থভাবে ফিরে যাওয়াই হোক আপনার আজকের সার্থকতা। শুভকামনা!


