মানুষ বড়ই বিচিত্র এক কলকব্জার কারখানা নিয়ে ঘোরে। এই কারখানার ভেতরে একটা অদৃশ্য ঘড়ি আছে, যাকে পণ্ডিতেরা বলেন ‘সার্কাডিয়ান রিদম’। প্রকৃতি এই ঘড়িটা সেট করে দিয়েছে সূর্যের সঙ্গে মিলিয়ে। সূর্য ডুবলে কারখানা বন্ধ হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা আধুনিক মানুষেরা করলাম কী—সূর্য ডোবার পর আমাদের আসল জীবন শুরু করলাম। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মানুষেরা। জ্যাম ঠেলে রাত দশটায় বাড়ি ফিরে, এগারোটা-বারোটায় মস্ত বড় এক ভোজ দিয়ে আমরা ভাবি—জীবন তো বেশ চলছে!
ভাই সাহেব, জীবন চলছে না, জীবন আসলে বিপথে যাচ্ছে। এই যে গভীর রাতে খাওয়া আর অসময়ে ঘুম—এটা আমাদের শরীরে এক অদ্ভুত ত্রিমাত্রিক সংকট তৈরি করছে।
রাত জাগা পাখির ক্ষুধা
রাত দশটার পর যখন আপনি ভারী খাবার খান, আপনার শরীর তখন ভীষণ অবাক হয়। সে তখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, অথচ আপনি তার ওপর চাপিয়ে দিলেন এক গাদা ক্যালরি। রাতের বেলা শরীরের বিপাকীয় ক্ষমতা বা মেটাবলিজম থাকে একদম তলানিতে। দিনের বেলা যে খাবার খেলে শক্তি হতো, রাতে সেই একই খাবার হয়ে যায় চর্বি। শরীর তখন অলসভাবে সেই চর্বিগুলো পেটের আশেপাশে জমা করতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা রাত দশটার পর ডিনার করেন, তাদের ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ঘুম এবং হরমোনের লুকোচুরি
ভারী খাবার খেয়ে যখন আপনি বিছানায় যান, তখন আপনার পাকস্থলী কিন্তু ঘুমায় না। সে তখন অক্লান্ত পরিশ্রম করে খাবার হজম করার চেষ্টা করছে। ফলে আপনার ঘুমটা গভীর হয় না। আপনি হয়তো সাত ঘণ্টা বিছানায় পড়ে থাকলেন, কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক আর শরীর ঠিকমতো বিশ্রাম পেল না।
এর ফল কী হয় জানেন? শরীরে ‘লেপটিন’ আর ‘ঘ্রেলিন’ নামের দুটো হরমোন আছে। তারা তখন ক্ষেপে যায়। ঘুমের অভাবে লেপটিন কমে যায় আর ঘ্রেলিন বেড়ে যায়। ফলে পরদিন আপনার প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগে, মনটা কেবল মিষ্টি আর ভাজাপোড়া খাবারের জন্য হাহাকার করে। শুরু হয় এক দুষ্টচক্র—অসময়ে খাওয়া, আধো-আধো ঘুম আর দিন দিন বাড়তে থাকা স্থূলতা বা মেদ।
সমাধানের সহজ টোটকা
জীবনটা আসলে খুব ছোট। এই ছোট জীবনে অকালে বুড়ো হয়ে যাওয়া কিংবা রোগে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। সমাধান খুব আহামরি কিছু নয়, মাত্র চারটা কাজ করলেই কেল্লাফতে—
১. রাতের খাবারটা সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটার মধ্যে সেরে ফেলুন।
২. খাবারটা হোক খুব হালকা। রাজকীয় ভোজটা বরং লাঞ্চের জন্য তুলে রাখুন।
৩. ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ওই জাদুকরী বাক্সটি (স্মার্টফোন) দূরে সরিয়ে রাখুন।
৪. প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমান।
শেষ কথা
প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কেউ কোনোদিন জিততে পারেনি। আমরা যখন রাত জেগে মুঠোফোনে নীল আলো দেখি আর পিৎজা-বার্গার চিবোই, প্রকৃতি তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে। স্থূলতা কেবল দেখার সৌন্দর্য নষ্ট করে না, এটি ভেতর থেকে আমাদের নিঃশব্দে ক্ষয় করে দেয়।
বাইরে হয়তো এখন ঝিঁঝিঁ ডাকছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুস্থ শরীরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খাওয়ার আনন্দই আলাদা। সেই আনন্দটা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে আজই একটু জলদি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন না!
শরীরটাকে একটু মায়া করুন। এই যন্ত্রটি একবার বিকল হলে সারা দুনিয়া দিয়েও কিন্তু সারানো যাবে না।
সাবধানে থাকবেন। শুভকামনা!


