মিরপুর ১০ নম্বরের এক চিলতে ফ্ল্যাটে বসে শিহাব সাহেব কপালে ভাঁজ ফেলে খবরের কাগজ পড়ছেন। তাঁর সামনে এক কাপ চা, যা এতক্ষণে জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে। কিন্তু শিহাব সাহেবের সেদিকে খেয়াল নেই। তাঁর সমস্ত মনোযোগ খবরের কাগজের এক কোণায়- সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে।
খবরটা খুশির হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শিহাব সাহেবের বুকটা একটু ধক করে উঠল। তিনি নিজে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বেতন যা পান, মাস শেষে সেটা দিয়ে বাবা-মা, স্ত্রী আর এক সন্তান নিয়ে পাঁচজনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “বিচিত্র এই দেশ! কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ।”
তাঁর স্ত্রী রেবেকা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “কী বিড়বিড় করছ একা একা? চা তো ঠান্ডা হয়ে শরবত হয়ে গেল।”
শিহাব সাহেব বিষণ্ন গলায় বললেন, “দেখছ রেবেকা, সরকারি লোকদের বেতন বাড়ছে। ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার থেকে এক লাফে ২০ হাজার করার কথা চলছে।”
রেবেকা নির্বিকার গলায় বলল, “ভালো তো। মানুষের হাতে টাকা আসবে।”
শিহাব সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আরে পাগলী, মানুষের হাতে টাকা আসা মানেই বাজারে আগুন লাগা। এদের বেতন বাড়ার খবর জানাজানি হওয়া মাত্র কাল থেকে আলুর কেজি ১০ টাকা বেড়ে যাবে। অথচ আমার বেতন তো বাড়ছে না। আমরা বেসরকারি খাতের ৭ কোটি মানুষ যাব কোথায়?”
শিহাব সাহেবের এই দুশ্চিন্তা যে একদম অমূলক নয়, সেটা দেশের বড় বড় অর্থনীতিবিদরাও বলছেন। ডক্টর সেলিম রায়হান কিংবা ডক্টর মাহফুজ কবীরের মতো বিদগ্ধ মানুষেরা কপালে চিন্তার রেখা ফেলে বসে আছেন। তাঁদের মতে, এই যে সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর হাতে হঠাৎ একগাদা টাকা চলে আসবে, এতে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়বে কিন্তু সরবরাহ হয়তো সেই অনুপাতে থাকবে না। ফলাফল- মূল্যস্ফীতি। সোজা বাংলায় জিনিসের দাম আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে।
সরকার অবশ্য পরিকল্পনা করছে বিশাল। ২০২৫ সালের নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বৈশাখী ভাতাও ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার কথা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে খুব শান্ত গলায় জানিয়েছেন, এই বেতন বৃদ্ধি একবারে হবে না, হবে ধাপে ধাপে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হবে এই যজ্ঞ।
সরকার বলছে, গত ১০ বছর কোনো পে-স্কেল হয়নি, তাই এই বৃদ্ধি অত্যন্ত যৌক্তিক। কথা সত্য। কিন্তু সমস্যা হলো ভারসাম্য নিয়ে। দেশে সরকারি চাকরিজীবী মাত্র সাড়ে ১৪ লাখ, আর বেসরকারি খাতে কাজ করে প্রায় ৭ কোটি মানুষ। সরকারি লোকজনের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেবেন, আর সেই বাড়তি দামের জোয়াল টানতে হবে শিহাব সাহেবের মতো সাধারণ মানুষকে।
অর্থনীতিবিদরা একটা গূঢ় কথা বলেছেন- আয় বৈষম্য। গরিব আরও গরিব হবে, আর একদল মানুষ সচ্ছল হবে। দরিদ্র সীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় নতুন টাকা বাজারে আসা মানে আগ আগুনে ঘি ঢালা। তার ওপর আবার সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। বাড়তি এই ৪৪ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করতে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। ব্যাংক থেকে সরকার টাকা তুলে নিলে ব্যবসায়ীরা টাকা পাবেন না, ফলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান হবে না। এক অদ্ভুত চক্কর!
শিহাব সাহেব খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রাখলেন। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে। বর্ষা বড় বিচিত্র ঋতু। কারো কাছে এই বৃষ্টি রোমান্টিক মনে হয়, কেউ বৃষ্টির শব্দে জানালার পাশে বসে খিচুড়ি খাওয়ার স্বপ্ন দেখে। আর শিহাব সাহেবের মতো মানুষের কাছে বৃষ্টির শব্দ মানে চালের দাম আর যাতায়াত ভাড়ার বেড়ে যাওয়ার পদধ্বনি।
তিনি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলেন। চা-টা বেশ তিতো লাগছে। হয়তো চা ঠান্ডা হয়ে গেছে বলে, অথবা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তাটা জিভের ডগায় চলে এসেছে বলে।
ঢাকা শহরের আকাশ মেঘলা। বৃষ্টির তোড়ে রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে। শিহাব সাহেব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবলেন- পৃথিবীতে সবকিছুরই দাম বাড়ে, শুধু মানুষের জীবনের দাম আর বেসরকারি খাতের চাকুরিজীবীদের আয় বাড়ে না। আশ্চর্য ব্যাপার!


