বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। এমন দিনে জানালার পাশে বসে এক কাপ কড়া লিকারের চা হাতে নিয়ে উদাস হয়ে থাকা যায়, আবার কোনো একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়াও শুরু করা যায়। মানুষ বড়ই বিচিত্র প্রাণী; সে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করে। কিন্তু মুশকিল হলো, আমরা ঝগড়া করতে গিয়ে প্রায়ই ‘ফাউল’ করে বসি। অথচ ঝগড়া হতে পারতো একটি শিল্প।

কাপল থেরাপিস্টরা (যাঁদের কাজই হলো মানুষের হাহাকার শোনা) বলছেন, ঝগড়া করলে সম্পর্ক নষ্ট হয় না, বরং নিয়ম মেনে ঝগড়া করলে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সেই নিয়মগুলো অনেকটা এইরকম-

১. সময় স্থান নির্বাচন: হুট করে মেজাজ খারাপ হলো আর চিৎকার শুরু করে দিলেন- সেটা কোনো কাজের কথা না। ঝগড়া করার জন্যও একটা প্রস্তুতি দরকার। দুজনে মিলে একটা সময় ঠিক করুন। বড় কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলার আগে হাতে এক কাপ কফি আর কিছু স্ন্যাকস রাখুন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ঝগড়া করাটা বেশ অভিজাত একটা ব্যাপার।

২. আদালতের নিয়ম: ঝগড়ার আগে দুজনে মিলে একটা অলিখিত চুক্তিতে সই করুন। গালিগালাজ করা যাবে না, একে অপরকে ছোট করে কথা বলা যাবে না এবং কোনোভাবেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করা চলবে না।

৩. কণ্ঠস্বরের ওঠানামা: রাগলে মানুষের গলার স্বর সপ্তমে চড়ে যায়। কাপল থেরাপিস্টরা বলছেন- কণ্ঠস্বর নরম রাখুন, কথা বলুন ধীরে। চিৎকার করলে শব্দ বেশি হয় ঠিকই, কিন্তু সারকথা কেউ শুনতে পায় না।

৪. অনুসন্ধানী হোন: ‘তুমি এটা কেন করলে?’- এভাবে জেরা না করে জিজ্ঞাসা করুন, ‘তুমি তখন কী ভাবছিলে?’ বিচারকের চেয়ে বড় কোনো গোয়েন্দা বা অনুসন্ধানী হওয়া অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। কৌতূহল মানুষকে কাছাকাছি আনে।

৫. অনুভূতির প্রকাশ: ‘আমি খুব রেগে আছি’ না বলে বলতে পারেন, ‘তোমার ওই কথায় আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।’ যুক্তি দিয়ে নিজের দুঃখটা বোঝান। রাগ মানুষের মনকে শক্ত করে, আর বিষণ্ণতা মনকে নরম করে।

৬. আসল জট খোলা: ঝগড়াটা হয়তো শুরু হয়েছে তরকারিতে লবণের পরিমাণ নিয়ে, কিন্তু এর মূলে হয়তো লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের অবহেলা কিংবা অনাদর। আসল সমস্যাটা খুঁজে বের করুন। জট না খুললে সুতো কখনো সোজা হয় না।

৭. স্পর্শের ম্যাজিক: ঝগড়ার মাঝখানে হঠাৎ সঙ্গীর হাত ধরা কিংবা কাঁধে হাত রাখা একটা অদ্ভুত শক্তিশালী কাজ। সামান্য এক স্পর্শে বড় বড় সংঘাত বরফের মতো গলে যেতে পারে।

৮. পাশাপাশি বসা: চোখে চোখ রেখে কথা বলতে গেলে মেজাজ আরও বিগড়ে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে ঝগড়া করুন। কিংবা দুজন দুদিকে মুখ করে পাশাপাশি বসে কথা বলুন। পাশাপাশি বসে কথা বললে মন খুলে বলা সহজ হয়।

৯. বিরতি নেওয়া: আলোচনা যখন তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন খানিকক্ষণের বিরতি নিন। কোনো একজন বারান্দায় গিয়ে একা একা কিছুক্ষণ বসে থাকুন কিংবা বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। তবে মনে রাখবেন- ফিরে অবশ্যই আসতে হবে। পালিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়।

১০. কান পেতে শোনা: উত্তর দেওয়ার জন্য কথা শুনবেন না, বরং বোঝার জন্য শুনুন। সঙ্গীর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঝপথে বাগড়া দেবেন না। শোনাও এক ধরণের প্রার্থনা।

১১. পুরোনো অভ্যাস বদলানো: কেউ ঝগড়ার সময় গুম মেরে থাকেন, কেউ আবার আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করেন। এই পুরোনো অভ্যাসগুলো পাল্টে একটু খোলামেলা ভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন। বিচিত্র এই দুনিয়ায় নিজেকে একটু বদলে নেওয়াটা মন্দ কী!

১২. একই দলে শেষ করা: দিনের শেষে যখন ঝগড়াটা ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন একে অপরকে মনে করিয়ে দিন-  ‘আমরা দুজন আসলে একপক্ষ, আর সমস্যাটা অন্যপক্ষ।’ সব সমস্যার সমাধান একদিনে হবে না। আজ রাতটা বরং শান্তির হোক, কাল না হয় আবার কথা বলা যাবে।

পরিশেষ:
ঝগড়া শেষে যদি দুজন মানুষের সম্মান আর ভালোবাসা অটুট থাকে, তবেই সেই ঝগড়া সার্থক। দিনশেষে আপনি একা নন, আপনার সঙ্গে আরও একজন মানুষ আছে- এই বোধটাই বড় চমৎকার। বৃষ্টির রাতটা ঝগড়া দিয়ে শুরু হলেও শেষটা যেন একটা স্নিগ্ধ আলিঙ্গন আর গরম চায়ের কাপেই হয়।

মানুষ বড়ই একা, আর সেই একলা জীবনে একজন মনের মতো ঝগড়া করার মানুষ পাওয়াও তো পরম ভাগ্যের ব্যাপার!