আজকালকার দুনিয়াটা বড়ই অদ্ভুত। এখন মানুষ কোথাও খেতে গেলে আগে সেই খাবারের ছবি তোলে, তারপর তৃপ্তি করে খায়। কোথাও ঘুরতে গেলে আগে চেক-ইন দেয়, তারপর চারপাশের প্রকৃতি দেখে। এমনকি ভালোবাসার মতো অতি ব্যক্তিগত বিষয়টিও এখন আর ব্যক্তিগত নেই। ডিজিটাল স্ক্রিনে যদি প্রিয়জনের সঙ্গে দাঁত বের করা একটা ছবি না থাকল, তবে নাকি সেই ভালোবাসা ঠিক ‘অকৃত্রিম’ হয় না। জেনারেশন জেড বা পরবর্তী প্রজন্ম একে বলছে ‘রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস’।

কিন্তু গবেষকরা বলছেন এক অন্যরকম কথা। তাঁরা মিকি মাউস কিংবা হিমুর মতো কোনো রহস্যময় চরিত্র নন, রক্ত-মাংসের মানুষ। তাঁদের গবেষণা বলছে- যারা নিজেদের সম্পর্কের কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানায় না, তারাই আসলে বেশি সুখী। বিচিত্র ব্যাপার, তাই না?

কেন গোপন থাকলেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে?

মানুষের মন বড়ই জটিল। গবেষকরা বলছেন, সুখী দম্পতিরা বাইরের মানুষের হাততালির জন্য অপেক্ষা করেন না। তারা যখন একে অপরের চোখে চোখ রেখে নিভৃতে এক কাপ চা খান, তখন সেই মুহূর্তটি তারা মন দিয়ে উপভোগ করেন। তাদের মাথায় এটা ঘোরে না যে-  ‘চায়ের কাপের সঙ্গে আমাদের একটি সুন্দর ছবি তোলা দরকার, যা দেখে ফেসবুকে তেরোশ মানুষ ‘ওয়াও’ রিঅ্যাক্ট দেবে।’ যখন আপনি দেখানোর চেয়ে দেখার দিকে বেশি মনোযোগ দেন, তখনই সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে।

পারফেক্ট হওয়ার নেশা এবং এক চিলতে হাহাকার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হলো একটা মস্ত বড় আয়না, তবে সেই আয়নায় মানুষ শুধু তার সুন্দর মুখটাই দেখে। কেউ তার ঝগড়া, মান-অভিমান কিংবা চোখের জলের ছবি পোস্ট করে না। সবাই দেয় তার সেরা মুহূর্তের সেরা ছবি। ফলাফল কী হয়? আপনি যখন অন্য দম্পতির হাসিখুশি ফিল্টার করা ছবি দেখেন, তখন নিজের অজান্তেই আপনার অবচেতন মন আপনার সম্পর্কের সঙ্গে তাদের তুলনা শুরু করে।

আপনি হয়তো ভাবছেন, ‘আহা, ওরা কত সুখে আছে, সারাদিন ঘুরে বেড়াচ্ছে! আর আমি ঘরে বসে জিপিএ-ফাইভ পাওয়া বাচ্চার পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত!’ এই যে তুলনা, এটাই হলো অসুখী হওয়ার প্রথম ধাপ। যারা ব্যক্তিগত জীবন আড়ালে রাখেন, তাদের এই ‘পারফেক্ট’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে হয় না।

গোপনীয়তার সুফল

সম্পর্ক যখন শুধু দুজনের থাকে, তখন সেখানে বাইরের মানুষের অনধিকার প্রবেশ থাকে না। আপনি যখন খুব শখ করে একটা ছবি পোস্ট করলেন, তখন একদল মানুষ প্রশংসা করবে ঠিকই, কিন্তু দু-একজন সূক্ষ্ম কোনো খুঁত বের করে দেবে। হয়তো কেউ বলল, ‘তোমাকে কিন্তু খুব একটা মানাচ্ছে না!’ এই সামান্য এক ফোঁটা বিষ আপনার সারাদিনের আনন্দ মাটি করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মনোযোগের পরিবর্তন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখানোর নেশায় আমরা একে অপরকে সময় দেওয়ার বদলে ফোনের ক্যামেরাকে সময় দিই বেশি। সুন্দর মুহূর্ত কাটানোর চেয়ে সুন্দর ছবি তোলাই তখন প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সম্পর্ক যে আপনাদের দুজনের একান্ত গোপন বাগান, সেই বোধটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

তবে কি কাউকে জানাব না?

ব্যাপারটি মোটেও তেমন নয়। আপনি আপনার প্রিয় মানুষের সঙ্গে ছবি দিতেই পারেন, সেটা কোনো অপরাধ নয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে- সেই ‘শেয়ার’ যেন আপনার সম্পর্কের ওপর ছড়ি না ঘোরায়। মানুষের মন্তব্যের চেয়ে নিজের মনের অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

শেষে একটা কথা বলি। রবীন্দ্রনাথ অনেক আগে বলে গেছেন-  ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’। কিন্তু বর্তমান যুগে গবেষকরা উল্টোটা বলছেন। সম্পর্কের গভীরতা ধরে রাখতে হলে সব কথা আর সব ছবি ফেসবুকে না বলাই ভালো। কিছু কথা শুধু দুজনের থাকুক। গোপন দীর্ঘশ্বাস আর গোপন ভালোবাসা- এর মধ্যে যে তীব্র এক মায়া আছে, তা ডিজিটাল স্ক্রিনের হাজার হাজার লাইক দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

মানুষ বড়ই একা, আর সেই একলা জীবনে একজন মনের মতো মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সেই ভাগ্যকে ফেসবুকের দেয়ালের চেয়ে নিজের মনের মণিকোঠায় বেশি যত্ন করে রাখাটাই বোধ হয় শ্রেয়।