মকবুল সাহেব অতিশয় সাবধানে তাঁর সঞ্চয়পত্রের পাতা উল্টান। প্রতি মাসে বেতন পাওয়ার পর তিনি কিছু টাকা ব্যাংকে রাখেন, কিছু টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করেন। তাঁর ধারণা, এভাবে টাকা জমাতে জমাতে তিনি একদিন অনেক বড়লোক হয়ে যাবেন। বিশাল একটা গাড়ি কিনবেন, সেই গাড়িতে চড়ে হাওয়া খেতে খেতে যাবেন। মকবুল সাহেব জানেন না, বড়লোক হওয়ার এই স্বপ্নে একটা বড়সড় ফুটো আছে। সেই ফুটো দিয়ে তাঁর জমানো টাকাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্পূরের মতো উড়ে যাচ্ছে।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, টাকা শুধু ব্যাংকে ফেলে রাখলে সেটা বাড়ে না, বরং কমে। একে বলে মুদ্রাস্ফীতির খেলা। সহজ করে বললে- আজ একশ টাকায় আপনি যে কয়টা লাল টকটকে আপেল কিনতে পারছেন, দশ বছর পর সেই একশ টাকা দিয়ে হয়তো একটা ছোট আমড়াও পাবেন না। কাগজের নোটের সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সেই নোটের ‘ক্ষমতা’ কমছে। আপনি যখন ভাবছেন আপনি এক কদম এগোচ্ছেন, মুদ্রাস্ফীতি নামের দানবটা আপনাকে আসলে দুই কদম পিছিয়ে দিচ্ছে।

টাকা কি ঘুমানোর জন্য?

অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, সঞ্চয় মানেই নিরাপত্তা। কথা সত্য। কিন্তু শুধু সঞ্চয় দিয়ে কেল্লাফতে হয় না। টাকা কোনো আলসে মানুষ নয় যে সে ব্যাংকের ভল্টে ঘুমাবে। টাকাকে কাজে পাঠাতে হয়। টাকা যখন আপনার হয়ে কাজ করবে, তখনই আপনি বড়লোক হওয়ার পথে হাঁটবেন। এর নাম হলো বিনিয়োগ। সেটা হতে পারে ব্যবসা, হতে পারে শেয়ারবাজার, রিয়েল এস্টেট কিংবা নিজের দক্ষতা বাড়ানো। টাকা যখন চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে, তখনই আসল খেলা শুরু হয়।

লেভারেজ এবং একটি লম্বা লাঠির গল্প

বড়লোক হওয়ার একটা অদ্ভুত জাদুমন্ত্র আছে, যাকে পণ্ডিতরা বলেন ‘লেভারেজ’। সহজ বাংলায় একে বলা যায়- নিজের সামান্য সম্বল দিয়ে পরের অনেক কিছু ব্যবহার করে বড় ফল পাওয়া।

ধরুন, আপনার কাছে পাঁচ লাখ টাকা আছে। আপনি ৩০ লাখ টাকার একটা ফ্ল্যাট কিনলেন। বাকি ২৫ লাখ টাকা আপনাকে দিল ব্যাংক। কয়েক বছর পর সেই ফ্ল্যাটের দাম যখন ৪০ লাখ হলো, তখন আপনার নিজের পাঁচ লাখ টাকার ওপর এক বিশাল মুনাফা হলো। এটাই লেভারেজ।

শুধু টাকা দিয়ে নয়, লেভারেজ খাটাতে হয় বুদ্ধিতেও। একা কাজ করলে আপনি দিনে মাত্র আট-দশ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। কিন্তু যদি একটা টিম থাকে, তবে আপনার হয়ে কাজ হবে শত শত ঘণ্টা। প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক কাজ দিয়ে বারবার ফল পাওয়াও একটা লেভারেজ। একটা বই লেখা, একটা ভিডিও বানানো কিংবা নতুন কোনো ভাষা শিখে আয় করা- এগুলো আপনার হয়ে দিনরাত কাজ করবে। আপনি যখন ঘুমাবেন, আপনার সিস্টেম তখন টাকা বানাবে।

ঝুঁকি এবং নুন-চিনি

অনেকে বলবেন, ঋণ নেওয়া বা বিনিয়োগ করা তো ঝুঁকির ব্যাপার। অবশ্যই ঝুঁকি আছে। তিতা ছাড়া যেমন নিমপাতা হয় না, ঝুঁকি ছাড়া তেমন বড়লোক হওয়া যায় না। ভুল বিনিয়োগ করলে যেমন লোকসান আছে, অতিরিক্ত ধার করলে তেমন মানসিক চাপ আছে। তবে হিসাব না করে ভয় পেয়ে বসে থাকাটা আরও বড় ঝুঁকি।

শেষ কথা

সঞ্চয় হলো আপনার ছাতা, যা আপনাকে বৃষ্টির দিনে রক্ষা করবে। কিন্তু বিনিয়োগ হলো আপনার চাষাবাদ, যা আপনাকে আগামী দিনে ফল দেবে। শুধু টাকা জমালে ভবিষ্যৎটা হয়তো কোনোমতে চলে যাবে, কিন্তু ভবিষ্যৎকে রাঙাতে হলে টাকাকে কাজে লাগাতে শিখতে হবে।

মকবুল সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে আবার হিসাব মেলাতে বসলেন। তিনি বুঝলেন, টাকা স্রেফ আলমারিতে তুলে রাখার জিনিস নয়, একে মুক্তি দিতে হয়। টাকাকে যখন আপনি স্বাধীন করে দেবেন আপনার জন্য কাজ করতে, তখনই আপনি প্রকৃত ধনী হওয়ার স্বাদ পাবেন।

জীবনটা বড় বিচিত্র, আর এই বিচিত্র জীবনে টাকার খেলাটা আরও রহস্যময়!