ঢাকা শহরটা এখন হয়েছে একটা বিশাল লোহার খাঁচা। এই খাঁচার ভেতর আমরা সবাই সারাদিন হুরমুর করে ছুটছি। দিনশেষে যখন আমরা ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরি, তখন আমাদের প্রাণটা একটু শান্তি চায়। সেই শান্তির খোঁজে মানুষ এখন তার ঘরের ভেতর এক টুকরো অরণ্যকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ঘর মানে তো আর কেবল চারটা দেয়াল আর একটা ছাদ নয়; ঘর হলো এমন একটা জায়গা যেখানে আপনি আপনার মুখোশটা খুলে রাখতে পারেন।

আজকাল গৃহসজ্জায় এক ধরণের অদ্ভুত এবং সুন্দর পরিবর্তন এসেছে। চলুন, সেই গল্পটাই একটু করা যাক।

অন্দরমহলে প্রকৃতির আনাগোনা
মানুষ এখন আর প্লাস্টিকের ঝকঝকে জিনিস দিয়ে ঘর ভরাতে চায় না। কেন জানি না, মানুষের মন এখন মাটির কাছাকাছি যেতে চাইছে। বসার ঘরের কোণে একটা মানিপ্ল্যান্ট কিংবা জানালার গ্রিল বেয়ে ওঠা লতানো গাছ – এতেই এখনকার মানুষ বেশি আনন্দ পায়। শোপিস হিসেবেও মানুষ বেছে নিচ্ছে বাঁশ, খড় কিংবা কাঠের তৈরি জিনিস। প্লাস্টিকের মেকি উজ্জ্বলতার চেয়ে কাঠের স্নিগ্ধ ছোঁয়া এখন অনেক বেশি দামি।

রঙে যখন লুকিয়ে থাকে মন
ঘরটা খুব বেশি কড়া রঙে রাঙানোর দিন শেষ। টকটকে লাল বা গাঢ় নীল এখন আর কারো পছন্দ নয়। মানুষ এখন দেয়ালের রঙে খুঁজছে মেঘলা আকাশ কিংবা নদীর তীরের বালুর রঙ। অফ হোয়াইট, হালকা ধূসর কিংবা স্যালমন রঙের দেয়াল মনকে এক ধরণের শান্ত ভাব দেয়। তবে তরুণরা আবার একটু অন্যরকম। তারা ঘরের তিন দেয়াল হালকা রেখে একটা দেয়ালকে খুব যত্ন করে সাজায় – যাকে বলে ‘অ্যাকসেন্ট ওয়াল’। সেটা যেন শান্ত মনে হুট করে জেগে ওঠা কোনো সুন্দর স্মৃতির মতো।

আলোর খেলা: ঝাপসা মায়া
ভাই সাহেব, আপনি কি লক্ষ্য করেছেন? এখনকার মানুষ আর মাথার ওপর সেই কড়া সাদা টিউবলাইট জ্বালিয়ে রাখতে চায় না। সেই আলোতে চোখের আরাম নেই। মানুষ এখন পছন্দ করছে ‘ওয়ার্ম লাইট’ বা উষ্ণ হলুদ আলো। ঘরটা তখন দেখতে অনেকটা স্বপ্নের মতো লাগে। সিলিং থেকে ঝোলানো ল্যাম্পশেড কিংবা কাঁচের ঝাড়বাতি দিয়ে এখন ঘরের ভেতর এক মায়াবী আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করা হয়।

ছোট্ট ঘর, মস্ত পরিকল্পনা
আমাদের মেট্রোপলিটন জীবনের অ্যাপার্টমেন্টগুলো তো আসলে একেকটা দিয়াশলাইয়ের বাক্সের মতো। এই ছোট জায়গাতেই আমাদের বড় বড় স্বপ্ন সাজাতে হয়। তাই আসবাবেও এসেছে পরিবর্তন। একটা সোফা, যা রাতের বেলা বেড হয়ে যায়; কিংবা একটা টেবিল, যা প্রয়োজনে ভাঁজ করে রাখা যায়। দেয়ালজুড়ে বড় একটা আয়না বসিয়ে ঘরটাকে বড় দেখানোর জাদুকরী কৌশল এখন অনেকেই জানেন। এই আয়নাটা যেন একটা মিথ্যে আশ্বাস, যা আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বলে – ঘরটা আসলে অনেক বড়!

শিকড়ের কাছে ফিরে আসা
সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, মানুষ এখন দেশীয় হস্তশিল্পের কদর করতে শুরু করেছে। ঘরের কুশনে নকশিকাঁথার কাজ কিংবা দেয়ালে স্থানীয় কোনো শিল্পীর ক্যানভাস – এগুলো ঘরের আভিজাত্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। জামদানির মোটিফ আঁকা পর্দা কিংবা মাটির তৈরি শোপিস ঘরে এক ধরণের বাঙালিয়ানা আবহ তৈরি করে।

শেষ কথা
গৃহসজ্জা আসলে কেবল সাজসজ্জা নয়; এটি হলো আপনার মনের জানালার প্রতিচ্ছবি। দিনশেষে আপনি যখন বাইরের যান্ত্রিকতা ফেলে ঘরে ঢোকেন, তখন যদি এক চিলতে সবুজ আপনার চোখে পড়ে, তবে আপনার সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তেই ধুয়ে যায়।

যাওয়ার আগে কিছু টিপস:

১. আপনার ঘরটা যদি ছোট হয়, তবে বড় একটা আয়না বসান। দেখবেন ঘরটা কেমন জাদুকরীভাবে বড় দেখাচ্ছে।
২. ঘরে যত বেশি সূর্যের আলো আসবে, আপনার মন তত বেশি প্রসন্ন থাকবে। প্রকৃতির আলোর মতো সুন্দর আর কিছুই নেই।
৩. ঘরের কোণে একটা ছোট গাছ রাখুন। তার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলুন। দেখবেন সে আপনার একাকীত্ব অনেকখানি দূর করে দিচ্ছে।

বাইরে হয়তো এখন বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত এক চাঁদ উঠেছে। এই সময়ে নিজের পছন্দমতো সাজানো ঘরটাতে এক কাপ চা নিয়ে বসলে জীবনটাকে কিন্তু খুব একটা মন্দ মনে হয় না। শুভ গৃহসজ্জা!