মানুষের ঘর হওয়া উচিত এমন একটা জায়গা, যেখানে ঢুকলে বাইরের পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। ঘর শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, ঘর হলো আপনার রুচি আর সৃজনশীলতার এক গোপন আয়না। একবিংশ শতাব্দীর এই ব্যস্ত সময়ে আমরা সবাই কেমন জানি যান্ত্রিক হয়ে পড়েছি। আমাদের ঘরগুলো হয়ে যাচ্ছে প্রাণহীন ‘মিনিমালিজম’-এর আড্ডাখানা। কিন্তু দিনশেষে আমরা কি সেই যান্ত্রিকতা চাই? নাকি চাই সেই পুরনো দিনের মা-দাদিদের হাতের ছোঁয়া, যা আমাদের মাটির কথা মনে করিয়ে দেয়?
২০২৬ সালে এসে আমাদের ঘরগুলো বড্ড ছোট হয়ে গেছে। ছোট ছোট খুপরি ঘরে দাদির আমলের সেই বিশাল সেগুন কাঠের আলমারি ঢোকানোর কথা ভাবলে এখন ‘গা ছমছম’ করে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা ঐতিহ্যের মায়া ছাড়ব? মোটেই না। ছোট ঘরেও কীভাবে দেশীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া রাখা যায়, চলুন আজ তা নিয়ে কিছুটা গল্প করা যাক।
রিকশা আর্ট: রঙের এক মহোৎসব
রিকশার পেছনে আঁকা সেই টকটকে লাল ফুল, ময়ূর কিংবা মানুষের মুখ – আমাদের চোখের খুব চেনা। এই লোকজ শিল্পটি এখন আর শুধু রাজপথের রিকশায় সীমাবদ্ধ নেই। আপনার বসার ঘরের কোণে একটা হাতে আঁকা জলচৌকি কিংবা সেন্টার টেবিলে একটা রিকশা পেইন্টিং করা টিস্যু বক্স রেখে দেখুন তো! ঘরটা মুহূর্তেই কেমন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রবেশপথের দেয়ালে একটা রিকশা পেইন্টিং করা আয়না ঝুলিয়ে দিলে অতিথি যখন ঘরে ঢুকবেন, তার চোখে যে বিস্ময় দেখা দেবে, সেটা দেখার মতো হবে। ‘যাত্রা’ কিংবা ‘বেশিদেশি’র মতো জায়গাগুলোতে এখন এসব চমৎকার জিনিসের মেলা বসে।
বাঁশ ও বেত: এক চিলতে শৈশব
অনেকদিন আমরা বেতের আসবাবকে অবহেলা করেছি। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। বেতের একটা দোলনা যদি বারান্দায় কিংবা বসার ঘরের কোণে ঝুলিয়ে দেন, তবে মনে হবে শৈশবটা যেন দোল খাচ্ছে। বাঁশ আর বেতের তৈরি ল্যাম্পশেড কিংবা ফুলদানি ঘরের ভেতর এক ধরণের স্নিগ্ধ আভিজাত্য এনে দেয়। পান্থপথ বা গ্রিন রোডের সেই দোকানগুলোতে গেলে আপনি এখনো সেই শৈল্পিক কারুকাজ খুঁজে পাবেন। এই উপকরণগুলো শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, এগুলো পরিবেশবান্ধবও বটে।
পাটের মায়া ও নকশিকাঁথার গল্প
পাটের জিনিস মানেই যে শুধু বস্তা – সেই দিন শেষ। পাট এখন শিল্পের নাম। রঙিন পুঁতি আর পাথরে সাজানো পাটের ঝুড়ি কিংবা দরজার সামনে একটা নকশাদার পাটের মাদুর আপনার রুচির পরিচয় দেবে। আর নকশিকাঁথার কথা তো বলাই বাহুল্য। মা-দাদিরা মমতা দিয়ে যে কাঁথা বুনতেন, সেই কাঁথা এখন দেয়ালসজ্জার অন্যতম অনুষঙ্গ। দেয়ালের এক কোণে একটা নকশিকাঁথা ফ্রেম করে ঝুলিয়ে দিন কিংবা পুরনো জামদানি শাড়ি দিয়ে সোফার ওপর একটা ‘থ্রো’ বানিয়ে রাখুন – ঘরটা আভিজাত্যে ঝলমল করে উঠবে।
টেরাকোটা: মাটির সোঁদা গন্ধ
শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা মাটির গন্ধ ভুলে গেছি। ঘরের তাকে ছোট ছোট টেরাকোটার পুতুল, ফুলদানি কিংবা মাটির ছোট ছোট হাঁড়িপাতিল রাখলে মনে হবে গ্রামের সেই বৈশাখী মেলাটা আপনার ঘরের ভেতর চলে এসেছে। দোয়েল চত্বরের সেই সার বেঁধে রাখা মাটির জিনিসগুলোর মধ্যে যে কী বিপুল মায়া লুকিয়ে থাকে, তা না দেখলে বোঝা যায় না।
শেষ কথা
তামা-পিতলের পুরনো সেই বাতি কিংবা পিতলের শৌখিন বাক্সগুলো হয়তো আগের মতো জনপ্রিয় নেই, কিন্তু এখনো কিছু রুচিশীল মানুষের ঘরে তারা সগৌরবে রাজত্ব করে। ঘর আসলে আপনার আত্মার প্রতিচ্ছবি। সেখানে যখন রিকশা আর্টের উজ্জ্বল রঙ কিংবা নকশিকাঁথার সূক্ষ্ম সুতোর কাজ মিশে যায়, তখন সেই ঘর আর কেবল চার দেয়াল থাকে না – তা হয়ে ওঠে একটা গল্প।
দেশীয় এই হস্তশিল্পগুলো শুধু ঘর সাজায় না, এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও পথ দেখায়। আসুন না, নিজের ঘরটাকে একটু মায়া দিয়ে সাজাই। যেখানে আভিজাত্য থাকবে, আধুনিকতা থাকবে, কিন্তু তার শিকড়টা থাকবে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে।
বাইরে হয়তো এখন বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এমন সময়ে ঘরটা যখন দেশীয় সাজে সেজে থাকে, তখন একা বসে চা খেতেও এক ধরণের অন্যরকম আনন্দ পাওয়া যায়। সেই আনন্দের ভাগ আপনি নেবেন না?


