মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, এই বিশাল পৃথিবীটা একটা জীবন্ত সত্তা। সে মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে পাশ ফেরে, আর তখনই আমাদের পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে। আমরা যারা এই ঢাকা শহরে গাদাগাদি করে থাকি, আমাদের জন্য এই ‘পাশ ফেরা’টা কিন্তু মোটেও সুখকর কোনো অভিজ্ঞতা নয়।
বিজ্ঞানীরা খাতা-কলম নিয়ে বসেছেন। তারা বলছেন, ঢাকা শহরটা নাকি এক অদ্ভুত জাদুকরী গোলকধাঁধা। এখানে কোনো কোনো মাটি খুব শক্ত, আবার কোনো কোনো এলাকা তাসের ঘরের মতো নড়বড়ে। ভূতাত্ত্বিক ভাষায় ঢাকাকে বলা হচ্ছে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’। কিন্তু মানুষের তৈরি এই জঙ্গল – যাকে আমরা গর্ব করে রাজধানী বলি – সেটাকে ঝুঁকিহীন ভাবার কোনো কারণ নেই।
যেখানে বিপদ ওত পেতে আছে: লাল তালিকার পনেরো নাম
ঢাকার কিছু এলাকার নাম শুনলে বুকটা কেমন জানি গুড়গুড় করে ওঠে। এসব এলাকায় দালানগুলো একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা খুব ভীতু কোনো কিশোর-কিশোরী। বিজ্ঞানীরা ১৫টি এলাকাকে ‘রেড জোন’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এলাকাগুলো হলো:
সবুজবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, কাফরুল, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর, গাবতলী, উত্তরা, সূত্রাপুর, শ্যামপুর, মানিকদী, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, খিলগাঁও এবং বাড্ডা।
এই এলাকাগুলোতে বিল্ডিং কোড বা নিয়মকানুনের বালাই নেই। সরু গলি দিয়ে দুপুরের রোদ যেমন ঢুকতে পারে না, তেমনি বড় কোনো বিপদ হলে উদ্ধারকারী দলও ঢুকতে হিমশিম খাবে। দাহ্য পদার্থের গুদাম আর ঘনবসতি মিলে এলাকাগুলো যেন একেকটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি।
দক্ষিণের দুঃখ ও উত্তরের ভয়
জরিপ চালানো হয়েছে ৩২টি এলাকায়। দেখা যাচ্ছে, ঢাকার দক্ষিণাঞ্চল – সেই কামরাঙ্গীরচর থেকে শুরু করে লালবাগ, সূত্রাপুর – ভীষণ বিপদে আছে। সরু রাস্তা আর পুরোনো দালানগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় দিন গুনছে। আবার উত্তরের কাফরুল, ইব্রাহিমপুর কিংবা গাবতলী এলাকাগুলোও কিন্তু খুব একটা নিশ্চিন্তে নেই। সামান্য কম্পনেই হয়তো বদলে যেতে পারে আমাদের পরিচিত সব মানচিত্র।
পুরোনো মাটির মায়া: যেখানে বিপদ কিছুটা কম
তবে সব খবরই কিন্তু খারাপ নয়। ঢাকার সব মাটি বেইমানি করে না। কিছু কিছু এলাকার মাটি শত বছরের পুরোনো এবং খুব শক্ত – যাকে বলে ‘কড়া ধাঁচের মাটি’। এই মাটি ভূমিকম্পের ঝাপটা সইবার ক্ষমতা রাখে। ভূতাত্ত্বিক বিচারে তুলনামূলক নিরাপদ এলাকাগুলো হলো:
রমনা, পল্টন, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, কোতয়ালি, মতিঝিল, ধানমন্ডি, শের–ই–বাংলা নগর, মিরপুর, ক্যান্টনমেন্ট, শাহ–আলী, গেন্ডারিয়া, গুলশান ও তেজগাঁও।
এই এলাকাগুলোতে বড় ভূমিকম্প হলেও মাটি হয়তো অনেকটা ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করবে। প্রকৃতির কী বিচিত্র খেয়াল! কেউ নিরাপদ আশ্রয়ে আছে, আর কেউ আছে খাদের কিনারায়।
শেষ কথা
মানুষ বড়ই বিচিত্র। সে জানে তার সামনের রাস্তাটা পিচ্ছিল, তবুও সে সেই পথেই হাঁটে। আমরা নকশাবহির্ভূত দালান তুলি, নিয়ম ভাঙার মহোৎসব করি – আর ভাবি আমরা বেঁচে যাব। কিন্তু প্রকৃতি যখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে, তখন কোনো দম্ভই টেকে না।
হয়তো কোনো এক নিস্তব্ধ রাতে পৃথিবীটা আবার পাশ ফিরবে। সেই রাতে আপনি কি আপনার জানালার গ্রিল ধরে চাঁদের আলো দেখতে পারবেন, নাকি মাটির গর্ভে বিলীন হয়ে যাবেন – তা কেউ জানে না। জীবনটা বড়ই অনিশ্চিত, বড়ই রহস্যময়।
বাইরে হয়তো এখন ঝিঁঝিঁ ডাকছে, কিংবা কোথাও এক চিলতে জোছনা পড়েছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে আমরা আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই। আসুন, নিজেদের ঘরগুলো অন্তত একটু মজবুত করে গড়ি। প্রকৃতির ওপর তো আমাদের হাত নেই, নিজেদের কর্মের ওপর তো আছে!
সাবধানে থাকবেন। আপনার চারপাশের মানুষগুলোকে একটু বেশি ভালোবাসুন। সময়টা যে বড়ই কম!


