গত কয়েকদিন ধরে পৃথিবীটা কেমন যেন একটু কেঁপে কেঁপে উঠছে। ছোটবেলায় ভূগোলে পড়েছিলাম, পৃথিবীটা দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সব টেকটোনিক প্লেটের ওপর। তারা যখন একে অপরের সঙ্গে একটু মান-অভিমান করে ধাক্কাধাক্কি করে, আমাদের পায়ের তলার মাটি তখন কেঁপে ওঠে। বিজ্ঞানের কথা বাদ দিন, ইদানীং ঢাকার মানুষের বুকের ভেতরটা যে কাঁপছে, সেটা তো নিশ্চিত।
ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। রাজউক নামের বিশাল এক প্রতিষ্ঠান আছে আমাদের। তারা শহর পাহারা দেয়। সেই রাজউকের হিসাব বলছে, ঢাকা শহরে দালানকোঠা আছে প্রায় ২২ লাখ। এর মধ্যে ২১ লাখ দালানই নাকি দাঁড়িয়ে আছে আলগা ভিত্তির ওপর। ভাই সাহেব, হিসাবটা একবার ভাবুন! ২২ লাখের মধ্যে ২১ লাখই নড়বড়ে। অর্থাৎ, আমরা যারা এই শহরে বাস করি, তারা আসলে তাসের ঘরে বাস করছি। বাতাস দিলে যেমন তাসের ঘর ভেঙে পড়ে, একটু জোরে ঝাঁকুনি দিলে আমাদের এই প্রিয় শহরটার অবস্থাও তেমন হতে পারে।
পুরান ঢাকার অদ্ভুত ভোজবাজি
রাজউক চেয়ারম্যান সেদিন বংশাল এলাকায় ঘুরতে গিয়ে বিস্ময়ে থ বনে গেলেন। সেখানে এক কাঠারও কম জমিতে ছয়-সাত তলা দালান উঠে গেছে। দালানগুলো একে অপরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হয় তারা খুব প্রেমে মগ্ন। আসলে তা নয়, তারা দাঁড়িয়ে আছে একে অপরের কাঁধে ভর দিয়ে। সামান্য কম্পন হলে এই দালানগুলো যেভাবে ভেঙে পড়বে, তা চিন্তা করলেও গায়ে কাঁটা দেয়। বিল্ডিং কোড বা নিয়মকানুনের ধার ধারেনি কেউ। নকশা একরকম, দালান আরেকরকম – এ এক আজব ভোজবাজি!
সরকারি দালানের অসুখ
সবচেয়ে মজার – বা বিষাদের – কথা হলো, সরকারিভাবে বানানো নতুন দালানগুলোরও নাকি ৩৭ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ। পিজি হাসপাতালের মতো বড় বড় হাসপাতাল কিংবা নামিদামি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনও এই তালিকায় আছে। যে দালানে মানুষ রোগ সারিয়ে সুস্থ হতে যায়, সেই দালানই যদি নিজে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে, তবে আমরা যাব কোথায়? মানুষ বড়ই বিচিত্র, তারা মৃত্যুর ওপর ঘর তোলে আর ভাবে তারা খুব নিরাপদে আছে।
পরিবেশ উপদেষ্টার দীর্ঘশ্বাস
সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আক্ষেপ করে বলছিলেন, গত পাঁচ বছরে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প আমরা আর অনুভব করিনি। এটা প্রকৃতির পক্ষ থেকে একটা বড় সতর্কবার্তা। কিন্তু আমরা কি সেই বার্তা শুনছি? ঢাকার ৯০ শতাংশ পুরোনো ভবনই নিয়ম মেনে বানানো হয়নি। সামান্য একটু মাটি সরিয়ে দেখলেই হয়তো দেখা যাবে, সেখানে রড-সিমেন্টের বদলে শুধু মানুষের লোভ আর ফাঁকি মিশে আছে।
মৃত্যুপুরীর অপেক্ষা?
স্থপতি আর নগরবিদরা কপালে ভাঁজ ফেলে বসে আছেন। তারা বলছেন, ঢাকার ১৩ শতাংশ জায়গায় কোনো দালান করাই ঠিক হয়নি, অথচ সেখানে এখন বহুতল ভবনের জঙ্গল। সংকীর্ণ গলি, চারদিকে ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তারের জাল আর মাটির নিচে গ্যাসের পাইপ – সব মিলিয়ে আমরা একটা বারুদের স্তূপের ওপর বসে জোছনা দেখার চেষ্টা করছি।
যখন বড় কোনো দুর্যোগ হয়, আমরা কয়েকদিন খুব হইচই করি। সেমিনার হয়, খবরের কাগজে বড় বড় শিরোনাম হয়। তারপর সব ঠান্ডা। আমরা আবার সেই নড়বড়ে দালানে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ি।
জীবনটা বড়ই বিচিত্র। আমরা জানি সামনে বিপদ, তবুও আমরা না চেনার ভান করে বসে থাকি। হয়তো কোনো একদিন পৃথিবীটা জোরে একটা ঝাঁকুনি দেবে, আর আমাদের সব দম্ভ, সব কারচুপি ধুলোয় মিশে যাবে। সেই দিন আসার আগেই কি আমাদের একটু নড়েচড়ে বসা উচিত নয়?
বাইরে হয়তো এখন বৃষ্টি পড়ছে, কিংবা আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে আমরা আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই। এক চিলতে নিরাপদ ছাদ কি আমাদের খুব বড় চাওয়া?
সাবধানে থাকবেন। পায়ের তলার মাটি কখন কেঁপে ওঠে, কেউ জানে না।


