মধ্যবিত্ত মানুষের অনেকগুলো স্বপ্নের মধ্যে একটা কমন স্বপ্ন হলো – একটা ঝকঝকে গাড়ি হবে, সেই গাড়িতে করে সপরিবারে জোছনা দেখতে যাওয়া হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, তেল-মবিলের দাম আর ইঞ্জিনের হুঙ্কার শুনতে শুনতে সেই স্বপ্ন অনেক সময় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পড়ে মনে হচ্ছে, সরকার বাহাদুর এবার একটু অন্যভাবে চিন্তা করছেন। তারা চাচ্ছেন, আমরা যেন তেলের ধোঁয়া না উড়িয়ে নিঃশব্দে ব্যাটারিচালিত গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াই।

ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আসুন, একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলি।

ইলেকট্রিক গাড়ির জাদুকরী দাম
আগে একটা ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি (EV) কিনতে গেলে ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হতো। করের বোঝা ছিল পাহাড়ের মতো – প্রায় ৯৩ শতাংশ! এবারের বাজেটে সেই পাহাড়কে অনেকটা কেটে ছোট করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২৫ হাজার ডলারের মধ্যে কোনো ইলেকট্রিক গাড়ি কিনলে কর হবে ৬৪ শতাংশ। আর ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত হলে সেটা ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ, গাড়িগুলো এখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নাগালে আসার একটু চেষ্টা করছে।

শুধু কি নিজের গাড়ি? না। স্কুলের বাচ্চাদের জন্য ইলেকট্রিক বাস আর মালামাল টানার ইলেকট্রিক ট্রাকের ওপর থেকে প্রায় সব কর তুলে নেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই মওকুফ চলবে। বাচ্চাদের বাসে করে স্কুলে যাওয়াটা এখন আরও একটু আনন্দময় হতে পারে।

চার্জিং স্টেশনে এবার উৎসব
ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হলো – মাঝরাস্তায় চার্জ ফুরিয়ে গেলে কী হবে? মোড়ে মোড়ে চার্জিং স্টেশন না থাকলে তো বিপদ! সরকার এবার সেখানেও হাত দিয়েছে। চার্জিং স্টেশনের যাবতীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে কোনো শুল্কই দিতে হবে না। শূন্য শতাংশ কর! অর্থাৎ, দেশজুড়ে চার্জিং স্টেশনের একটা হুলুস্থুল পড়ে যাবে বলে আশা করা যায়।

তেলচালিত গাড়ির মন খারাপ
তবে সব খবর কিন্তু মিষ্টি নয়। যারা এখনো সেই পুরনো ধাঁচের ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসির তেলচালিত গাড়ি ভালোবাসেন, তাদের কপাল একটু পুড়বে। সরকার চাচ্ছে আপনারা যেন তেল পুড়িয়ে পরিবেশ নষ্ট না করেন। তাই এসব গাড়ির ওপর কর ১৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ করা হয়েছে।

হিসাবটা একটা সাধারণ উদাহরণের মাধ্যমে দিই। আগে যে গাড়িটার দাম ছিল ৬৯ লাখ টাকা, এখন সেই একই গাড়ি কিনতে আপনার পকেট থেকে খসবে প্রায় ৭৭ লাখ টাকা! স্রেফ করের কারণেই দাম বেড়ে যাচ্ছে সাত লাখ টাকার ওপর। মন খারাপ করার মতো খবরই বটে!

মেইড ইন বাংলাদেশ
সবচেয়ে বড় সুখবর হলো, সরকার চাচ্ছে আমাদের দেশের মানুষ যেন নিজেরাই এসব ইলেকট্রিক গাড়ি বানায়। যারা দেশে বসে গাড়ির বডি বানাবে, রঙ করবে বা পার্টস জোড়া দেবে, তাদের জন্য শুল্ক একদম কমিয়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমরা যদি নিজেদের গাড়ি নিজেরাই বানাতে পারি, তবে তার চেয়ে বড় আনন্দের আর কী হতে পারে!

শেষ কথা
দুনিয়ায় কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তেলের দিন ফুরিয়ে আসছে, আসছে ব্যাটারির দিন। সরকার বাহাদুর করের লাঠি দিয়ে আমাদের সেই নতুন দিনের দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন। আগামীতে হয়তো নীল রঙের একটা শান্ত ইলেকট্রিক গাড়িতে চড়ে আমরা জোছনা দেখতে বের হব। সেখানে তেলের গন্ধ থাকবে না, ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দ থাকবে না – থাকবে শুধু এক অদ্ভুত নীরবতা।

জীবনটা আসলে খুব বিচিত্র। বাজেটের অংকের ভেতরেও কখনো কখনো এমন সুন্দর স্বপ্নের বীজ লুকিয়ে থাকে। সেই স্বপ্নের জয় হোক! সাবধানে থাকবেন, আর গাড়ির ব্যাটারি চার্জ দিতে ভুলবেন না যেন।