আজকের সকালটা অন্যরকম হতে পারতো। জানালার পাশে বসে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ পড়তে পড়তে ভাবা যেত- আহা, জীবনটা কতই না সুন্দর! কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা বাস করি ঢাকা শহরে। এখানে জানালা খুললে অরণ্যের স্নিগ্ধতা আসে না, আসে এক দলা কালো ধোঁয়া আর পাশের কনস্ট্রাকশন সাইটের কান ফাটানো শব্দ।

খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে আরও মন খারাপ হয়ে গেল। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের একটা তালিকা করেছে। ১৭৩টি শহরের মধ্যে আমাদের ঢাকা হয়েছে ১৭১তম। অর্থাৎ, নিচ থেকে হিসেব করলে আমরা ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছি- তৃতীয় স্থান! আমাদের নিচে আছে শুধু সিরিয়ার দামেস্ক আর লিবিয়ার ত্রিপোলি। এই দুটি শহরই যুদ্ধবিধ্বস্ত। বোমা-বারুদের শব্দের সাথে পাল্লা দিয়েও তারা আমাদের নিচে নামাতে পারছে না। আমরা যুদ্ধ ছাড়াই প্রায় তাদের সমান অবস্থানে পৌঁছে গেছি। একেই বোধ হয় বলে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা।

ঢাকা শহরের আড়াই কোটি মানুষ প্রতিদিন এই ‘অযোগ্য’ শহরের জন্য চড়া মূল্য দিচ্ছে। বায়ুদূষণ, যানজট, আর জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়- সব মিলিয়ে আমাদের জীবনটা হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকে থাকার এক নিরন্তর লড়াই।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে মাথা আরও ঝিমঝিম করে। ১০০-র মধ্যে ঢাকার স্কোর মাত্র ৪২। এর মানে হলো, আমরা নরকের ঠিক এক ধাপ ওপরে দাঁড়িয়ে আছি। পাঁচটি সূচকের মধ্যে অবকাঠামোতে আমাদের নম্বর মাত্র ২৭। অথচ গত কয়েক বছর ধরে চারদিকে ফ্লাইওভার আর বড় বড় দালানের সে কী ধুম! হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হলো, কিন্তু সূচক বলছে- সবই গেছে ১০-১৫ ভাগ মানুষের সুবিধায়। বাকি বিশাল জনগোষ্ঠী সেই কাদা-পানি আর ঘিঞ্জি বস্তিতেই রয়ে গেল। উন্নয়নের জোয়ার বোধ হয় সবার ঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের শিক্ষার স্কোর ৬৭। অর্থাৎ, এই অযোগ্য শহরেও ছেলেমেয়েরা মন দিয়ে পড়াশোনা করছে। হয়তো তারা এই আশায় পড়ছে যে, একদিন খুব ভালো রেজাল্ট করে এই ১৭১ নম্বর শহর ছেড়ে এক নম্বর বা দুই নম্বর কোনো শহরে পাড়ি জমাবে। এটাকে কি দেশপ্রেমহীনতা বলবো? নাকি বাঁচার আকুতি?

স্বাস্থ্যসেবার স্কোর ৪২। এর মানে হলো, এই শহরে অসুস্থ হওয়া এক বিলাসিতা। অসুস্থ হলে হাসপাতালের সিট পাওয়া যেমন ভাগ্যের ব্যাপার, চিকিৎসার খরচ মেটানো তেমনি দুঃসাধ্য। অথচ নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দেশ সিঙ্গাপুর হয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, তাঁরা বোধ হয় ভুল করে অন্য কোনো দেশের মানচিত্র দেখছেন।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নাকি বাংলাদেশে আসতে চাইছেন না। আসবেনই বা কেন? যে শহরে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, যে শহরে এক মোড় থেকে অন্য মোড়ে যেতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে টাকা ঢালতে কারই বা রুচি হবে? একটি শহরকে কেবল ইট-পাথরের জঞ্জাল বানালেই হয় না, তাকে প্রাণবন্ত আর অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হয়। আমাদের ঢাকা শহরটা যেন অনেকটা সেই মেকআপ করা বৃদ্ধার মতো, যার গয়নার চাকচিক্য আছে কিন্তু ভেতরের হাড়গুলো জীর্ণ হয়ে পড়েছে।

সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা প্রতি বছর অজস্র প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁরা ঢাকাকে তিলোত্তমা বানাবেন বলে কসম খান। কিন্তু দিনশেষে ঢাকা সেই অন্ধকার গলি আর যানজটের শহরই থেকে যায়।

মীর মশাররফ হোসেন বোধ হয় আজকের ঢাকার কথা ভেবেই লিখেছিলেন-  ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’। আমরাও এখন উদাসীন পথিক হয়ে গেছি। আড়াই কোটি মানুষ জ্যামে বসে ঘামছি আর ভাবছি- পরের বার তালিকায় আমাদের অবস্থান কি ১৭২ হবে? দামেস্ককেও কি আমরা ছাড়িয়ে যাব?

বিচিত্র এই দেশ, আর বিচিত্র আমাদের সহ্য ক্ষমতা! অদ্ভুত!