আজ মাসের আঠাশ তারিখ। মকবুল সাহেব বিমর্ষ মুখে বারান্দায় বসে আছেন। তাঁর হাতে এক কাপ লিকার চা, যেটাতে চিনির পরিমাণ খুব কম। চিনির দাম বেড়েছে কি না তিনি জানেন না, তবে তাঁর পকেটের অবস্থা যে সুবিধের নয়, সেটা তিনি ঠিকই টের পাচ্ছেন। মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার পর তিনি ভেবেছিলেন – এই মাসে অন্তত দু-এক হাজার টাকা জমিয়ে ফেলবেন। অথচ আজ মানিব্যাগ খুলে দেখলেন, সেখানে কয়েকটা খুচরো পয়সা আর একটা পুরোনো রসিদ ছাড়া আর কিছুই নেই।
টাকাগুলো কোথায় গেল? তিনি কি খুব বিলাসিতা করেছেন? না। তিনি কি দামী কোনো রেস্টুরেন্টে খেয়েছেন? তাও না। অথচ টাকাগুলো কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। ঠিক এই মুহূর্তেই আমাদের দরকার এক চিলতে জাপানি জাদু। যার নাম – ‘কাকেবো’।
কাকেবো (Kakeibo) শব্দটা শুনতে একটু রহস্যময় লাগলেও এর অর্থ খুব সহজ – ‘পরিবারের হিসাবের খাতা’। ১৯০৪ সালে হানি মোতোকো নামের এক জাপানি নারী সাংবাদিক এই পদ্ধতির সূচনা করেছিলেন। তিনি জানতেন, মধ্যবিত্তের পকেটে ফুটো থাকে। সেই ফুটো বন্ধ করার দাওয়াই হলো এই কাকেবো।
কাকেবো জাদুর মূল মন্ত্র
আমরা সাধারণত ভাবি—মাস শেষে সব খরচ করার পর যা থাকবে, তা-ই জমাব। হানি মোতোকো বলছেন, এই ভাবনাটাই ভুল। কাকেবো বলে—বেতন পাওয়ার সাথে সাথেই আগে সঞ্চয়ের টাকাটা সরিয়ে ফেলুন। তারপর যা থাকবে, সেটা দিয়েই মাস চালান।
ধরুন, আপনার আয় ৩০ হাজার টাকা। আপনি ঠিক করলেন ৩ হাজার টাকা জমাবেন। বেতন পাওয়ার পর আপনার প্রথম কাজ হলো ওই ৩ হাজার টাকা আলাদা করে আলমারির নিচে লুকিয়ে রাখা (কিংবা অন্য কোনো নিরাপদ জায়গায়)। এখন আপনার আসল আয় হলো ২৭ হাজার টাকা। আপনি ‘বাকি টাকা’ জমাচ্ছেন না, বরং ‘জমানো টাকা বাদে বাকিটা’ খরচ করছেন। শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর প্রভাব অসাধারণ।
কাকেবো পালনের পাঁচটি ধাপ (বা পাঁচটি সহজ পাঠ)
১. হিসাব লেখা: প্রথম কাজ হলো একটা সুন্দর ডায়েরি বা খাতা কেনা। ফোনের অ্যাপে হিসাব রাখলে সেই মায়া তৈরি হয় না যা কলম দিয়ে কাগজে লিখলে হয়। মাসের শুরুতে লিখুন আপনার মোট আয় কত, আর বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিলের মতো একদম জরুরি খরচগুলো কত।
২. সঞ্চয়কে আদর করা: সঞ্চয়কে ভাবুন একটা আবশ্যিক খরচ হিসেবে। একে শুরুতেই সরিয়ে রাখুন।
৩. প্রতিদিনের ছোট খাতা: প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দিন। আজ কত খরচ হলো – তা ছোট ছোট করে লিখে রাখুন। যখন আপনি হাতে লিখবেন, তখন প্রতিটি টাকার জন্য আপনার মায়া লাগবে। এই মায়াই হলো কাকেবোর আসল জাদু।
৪. চারটি খোপের হিসাব: আপনার খরচগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করুন:
- আবশ্যিক: চাল, ডাল, বাড়িভাড়া।
- ইচ্ছা: শখের কেনাকাটা বা বাইরের খাবার।
- সাংস্কৃতিক: বই কেনা বা সিনেমা দেখা (মনকে খাবার দেওয়া)।
- অতিরিক্ত: হুট করে আসা বিপদ বা কারো বিয়েতে উপহার।
৫. আয়নার সামনে দাঁড়ানো: মাস শেষে নিজের খাতাটার দিকে তাকান। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন – আমি কি লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছি? কোথায় আমি একটু বেশি ‘মুদা’ (জাপানি শব্দে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়) করেছি? উত্তরটা পেলেই পরের মাসটা আরও সুন্দর হবে।
পরিশেষ
হানি মোতোকো শতবর্ষ আগে শিখিয়ে গেছেন – সঞ্চয় কোনো গাণিতিক বিষয় নয়, এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। আপনি যদি আপনার টাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ না রাখেন, তবে টাকা আপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করবে।
মকবুল সাহেব চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে ভাবলেন, কালই একটা নীল রঙের ডায়েরি কিনতে হবে। ডায়েরির প্রথম পাতায় বড় বড় করে লিখবেন – ‘কাকেবো’। কে জানে, হয়তো জাপানি এই সাংবাদিকের হাত ধরেই তাঁর শূন্য পকেটে আবার নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হবে।
মানুষ বড় বিচিত্র প্রাণী, সে জমানোর চেয়ে খরচ করতেই বেশি ভালোবাসে। কিন্তু ডায়েরির পাতায় যখন খরচের হিসাবগুলো কথা বলতে শুরু করে, তখন মানুষ সচেতন হতে বাধ্য হয়। আর সচেতনতা থেকেই শুরু হয় সঞ্চয়।


