ঢাকা শহরটা এখন হয়েছে অনেকটা ওই মেলা থেকে কিনে আনা ছোট কাঁচের বয়ামের মতো। বয়াম ভর্তি মার্বেল আছে, নতুন করে একটা মার্বেল ঢোকানোর জায়গা নেই। কিন্তু মানুষের তো আর মার্বেল হয়ে বসে থাকলে চলে না, তাদের থাকার জন্য ঘর লাগে, মাথার ওপর এক চিলতে ছাদ লাগে। সেই ছাদ জোগাড় করতে গিয়েই এখন হিমশিম খাচ্ছেন আমাদের আবাসন ব্যবসায়ীরা, যাদের আমরা চিনি ‘রিহ্যাব’ নামে।
বিষয়টি নিয়ে সেদিন ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক রাজকীয় বৈঠক হয়ে গেল। একদিকে রাজউকের বড় বড় কর্মকর্তারা, অন্যদিকে রিহ্যাবের হর্তাকর্তারা। বাইরে হয়তো তখন তপ্ত রোদ কিংবা ঝিরঝিরে বৃষ্টি – তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের মাথার ভেতর ঘুরছে ‘ড্যাপ’ (DAP) আর ‘ফার’ (FAR) নামের দুটো অদ্ভুত শব্দ।
গল্পটা আসলে কী?
আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকায় মাটির বড় অভাব। এক টুকরো জমি এখন সোনার চেয়েও দামি। জমি যেহেতু বাড়ছে না, তাই সমাধান একটাই – বিল্ডিংগুলোকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেখানে বাগড়া দিচ্ছে ‘ড্যাপ’ নামের এক নিয়ম। রিহ্যাব নেতারা বলছেন, ড্যাপের বর্তমান নিয়মে বিল্ডিং খুব বেশি উঁচুতে তোলা যাচ্ছে না, ফলে ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তারা চাচ্ছেন ‘ফার’ (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) বাড়ানো হোক। অর্থাৎ, একই জমিতে যেন আরও বড় এবং উঁচু বিল্ডিং বানানো যায়।
রিহ্যাব সভাপতি আলী আফজাল সাহেব বেশ গুছিয়ে কথা বলেন। তিনি বললেন, নিয়মগুলো এমন হতে হবে যা বাস্তবসম্মত। শুধু খাতা-কলমে আদর্শ নগরী বানাতে গিয়ে যদি মানুষের থাকার জায়গাই না থাকে, তবে সেই পরিকল্পনার মানে কী? ফ্ল্যাট তৈরির খরচ বেড়ে গেলে শেষমেশ সেই বোঝা তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপে।
রাজউকের আশ্বাস: মেঘের আড়ালে সূর্য?
বৈঠকে রাজউকের নতুন চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম সাহেব মন দিয়ে সব শুনলেন। তিনি অনেকটা আশার বাণী শোনালেন। বললেন, এখন থেকে নাকি বিল্ডিংয়ের নকশা অনুমোদনের জন্য বছরের পর বছর রাজউকের বারান্দায় ঘুরতে হবে না। মাত্র ৩০ কর্মদিবসেই নাকি সব কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুনতে বেশ ভালো লাগে, যেন রূপকথার মতো। ৩০ দিনে অনুমতি! যদি সত্যিই হয়, তবে তো কথাই নেই।
এর আগে বিদায়ী সরকারও ব্যবসায়ীদের চাপে পড়ে ড্যাপে কিছু পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু তাতে মন ভরেনি রিহ্যাব নেতাদের। তারা চান আরও নমনীয়তা। কারণ, ব্যবসার হিসেব আর সাধারণ মানুষের স্বপ্ন – এই দুটোর মধ্যে তাল মেলানো বড় কঠিন কাজ।
শেষ কথা
ঢাকা শহরটা কি সত্যিই কোনোদিন পরিকল্পিত হবে? যেখানে মানুষের জানালার পাশে এক চিলতে কৃষ্ণচূড়া থাকবে, আর রাতে বারান্দায় বসে জোছনা দেখা যাবে? নাকি আমরা শুধুই কংক্রিটের পাহাড় বানিয়ে যাব?
রিহ্যাব আর রাজউকের এই দড়ি টানাটানির মাঝে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসটা থেকেই যায়। তবুও আমরা স্বপ্ন দেখি। কারণ মানুষ স্বপ্ন নিয়েই বেঁচে থাকে। হয়তো কোনো একদিন ড্যাপ সংশোধন হবে, ফ্ল্যাটের দাম কমবে, আর আমাদের মধ্যবিত্তরা নিজেদের এক চিলতে ঘরে বসে নিশ্চিন্তে এক কাপ চা খেতে পারবে।
সেই সুদিনের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে! শুভকামনা ঢাকা, শুভকামনা ড্যাপ!


