টাকা জিনিসটা বড়ই বিচিত্র। লোকে টাকার জন্য জীবন দেয়, আবার সেই টাকা হাতে নিয়ে হাসিমুখে আঙুলে থুতু ছিটিয়ে গোনেন। অথচ বিজ্ঞান বলছে, এই পরম আদরের টাকা আসলে এক একটা জীবন্ত জীবাণুর গুদাম। আপনি যখন খুব শখ করে পকেট থেকে দশ টাকার একটা কড়কড়ে নোট বের করছেন, তখন হয়তো সেই নোটে তিন হাজার প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া আপনার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক নিছক কৌতূহলবশত টাকার নোট পরীক্ষা করেছিলেন। যা বের হলো, তা শুনে সুস্থ মানুষের মূর্ছা যাওয়ার দশা। একটি টাকার নোটে যে পরিমাণ জীবাণু থাকে, তা নাকি একটা ব্যবহৃত টয়লেট সিটের চেয়েও বেশি। তার মানে, টয়লেট সিটকে আমরা যতটা ঘৃণা করি, টাকার নোট তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি নোংরা। অথচ আমরা টয়লেট থেকে বেরিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুই, কিন্তু টাকা হাতবদল করার পর সেই হাতেই দিব্যি পরোটা ছিঁড়ে খাই। বিচিত্র এই মানব জীবন!

টাকা কেন এত নোংরা?

কারণটা সহজ। টাকা হলো এক যাযাবর। সে কারো কাছেই স্থির থাকে না। আজ যে টাকা মাছের বাজারের রক্ত-জলে ভেজা কোনো এক বিক্রেতার হাতে ছিল, কাল তা-ই চলে যাচ্ছে হাসপাতালের ক্যাশ কাউন্টারে। তারপর ঘুরেফিরে আপনার পকেটে। টাকার কাগজের তন্তুগুলো খুব অদ্ভুত, সে মানুষের হাতের ঘাম, ধুলোবালি আর আর্দ্রতাকে চুম্বকের মতো টেনে নেয়। জীবাণুরা সেখানে রীতিমতো পিকনিক করে। একেকটা নোটে ই-কোলাই থাকে (যা আপনার পেটের বারোটা বাজিয়ে দেবে), থাকে স্ট্যাফাইলোকক্কাস- যে আপনার ত্বক থেকে ফুসফুস পর্যন্ত সবখানে ঝামেলা পাকাতে পারে। এমনকি সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাসও টাকার নোটে কয়েকদিন আয়েশ করে বেঁচে থাকতে পারে।

সবচেয়ে ভয়ংকর অভ্যাস

আমাদের দেশের মানুষ টাকা গোনার সময় একটা বিশেষ টেকনিক ব্যবহার করেন- আঙুলে থুতু লাগানো। এটা এক ধরণের জাতীয় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। আপনি যখন থুতু দিয়ে টাকা গুনছেন, আপনি আসলে টাকার নোটের হাজার বছরের জমানো জীবাণুকে সসম্মানে আপনার মুখে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। এর চেয়ে বড় আত্মঘাতী কাজ আর কী হতে পারে?

কী করা উচিত?

জীবন তো আর থেমে থাকবে না, লেনদেনও চলবে। তবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের কাজ:

১. টাকা নাড়াচাড়া করার পর ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। যদি হাতের কাছে সাবান না থাকে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।

২. আঙুলে থুতু লাগিয়ে টাকা গোনার অভ্যাসটা আজই ত্যাগ করুন। প্রয়োজনে এক বাটি জল পাশে রাখুন।

৩. ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হোন। কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অন্তত আপনার হাত কোনো জীবাণুর ‘মিউজিয়াম’ স্পর্শ করছে না।

৪. আপনার মানিব্যাগ বা পার্সটি মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করুন। টাকার সাথে ভুলেও রুমাল বা টিস্যু পেপার রাখবেন না।

৫. বাচ্চাদের হাতে টাকা দেবেন না। তারা না বুঝে টাকা মুখে দিতে পারে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

টাকা জীবন চালায় ঠিকই, কিন্তু সেই টাকাই যেন জীবন না কেড়ে নেয়। সচেতন হওয়া দরকার। সচেতনতা মানুষের এক মহৎ গুণ। আসুন, আমরা টাকা ধরার পর অন্তত একবার হলেও হাত ধুই। শরীরটা সুস্থ থাকলে দুনিয়ার সব টাকাই আপনার। আর শরীর না থাকলে ওই জমানো টাকার নোটগুলো আপনার কোনো কাজেই আসবে না।

মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল- এই কথাটা ছোটবেলায় মুখস্থ করেছিলেন কেবল পরীক্ষার খাতায় লেখার জন্য নয়, বাস্তব জীবনেও মাঝেমধ্যে প্রয়োগ করতে হয়।